শিয়া ইমামগণ

wikishia থেকে

এ প্রবন্ধটি বার ইমামের পরিচয় সম্পর্কিত। শিয়াদের বার ইমামের পরিচয় (সংক্ষিপ্ত জীবনী) এবং তাঁদের ইমামতের সপক্ষে দলীল সম্পর্কে জানতে দেখুন।

শিয়ারা মহানবির (সা.) বর্ণিত হাদীসানুযায়ী তাঁর আহলে বাইতের (বংশের) বার জন ব্যক্তিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসূলের উত্তর সূরি এবং স্থলাভিষিক্ত মনে করে যারা তাঁর পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের দায়িত্বপ্রাপ্ত। প্রথম ইমাম হলেন হযরত আলী (আ.) আর বাকী ইমামরা হলেন হযরত আলী ও ফাতেমার (আ.) সন্তান ও বংশধর।

বারো ইমামী শিয়ারা বিশ্বাস করে ইমামরা মহান আল্লাহর দ্বারা মনোনীত এবং তাঁরা অবশ্যই আল্লাহ প্রদত্ত গায়েবী জ্ঞান, নির্ভুল হওয়া ও নিষ্পাপতার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। আর তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে শাফায়াতের অধিকার লাভ করেছেন। ইমামরা ওহি লাভ (নবুওয়াত) ও শরীয়তের অধিকারী হওয়া ছাড়া মহানবির (সা.) ওপর যে সকল দায়িত্ব অর্পিত ছিল তার সবগুলোরই দায়িত্বপ্রাপ্ত। আহলে সুন্নাত আহলে বাইতের ইমামদর নেতৃত্বকে মানে না কিন্তু তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে এবং অন্যান্য ফকিহদের পাশাপাশি তাদেরকেও আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিত্ব হিসাবে স্বীকার করে।

পবিত্র কোরআনে ইমামদের নাম আসেনি (তবে ঐশী ইমামতের অধিকারীদের বৈশিষ্ট্যসমূহ সূরা আম্বিয়ার ৭৩, সূরা সিজদার ২৪,সূরা বাকারার ১২৪ ও অন্যান্য সূরার আয়াতসমূহে বর্ণিত হয়েছে) কিন্তু মহানবির (আ.) হাদীসসমূহে যেমন জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারির বর্ণিত হাদীসে ইমামদের সংখ্যা দাঁদের নামসহ উল্লিখিত হয়েছে। তাছাড়া মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত অনেক হাদীসেই তাঁর বারো জন স্থলাভিষিক্তের কথা বরা হয়েছে যাদের সকলেই কুরাইশ থেকে হবে বলা হয়েছে।

বারো ইমামী শিয়াদের মতে ইমাম আলী (আ.) মহানবির (সা.) প্রত্যক্ষ ও অকাট্য ঘোষণার দ্বারা ইমামতে দায়িত্ব লাভ করেন। অতঃপর প্রত্যেক ইমাম অকাট্য ও সুস্পষ্টভাবে তাঁর পরবর্তী ইমামকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। মহানবির (সা.) বারোজন স্থলাভিষিক্ত যথাক্রমে: আলী ইবনে আবি তালিব, হাসান ইবনে আলী, হোসাইন ইবনে আলী, আলী ইবনে হোসাইন, মুহাম্মাদ ইবনে আলী, জাফর ইবনে মুহাম্মাদ, মুসা ইবনে জাফর, আলী ইবনে মুসা, মুহাম্মাদ ইবনে আলী, আলী ইবনে মুহাম্মাদ, হাসান ইবনে আলী ও মুহাম্মাদ ইবনে হাসান (আলাইহিমুস সালাম)

শিয়াদের প্রসিদ্ধ মতে এগার জন ইমাম শহীদ হয়েছেন এবং দ্বদশ ইমাম প্রতিশ্রুত মাহদী (আ.) গায়বাতে (লোকচক্ষুর অন্তরালে) রয়েছেন যিনি ভবিষ্যতে আত্মপ্রকাশ করে পৃথিবীকে ন্যায়বিচার ও সত্যের আলোয় পূর্ণ করবেন।

আহলে সুন্নাত শিয়াদের অনুসৃত বার ইমামকে মহানবির (সা.) অব্যবহিত পরের বারো জন স্থলাভিষিক্ত হিসাবে মানে না কিন্তু তাঁদের ভালবাসে। শিয়া ইমামদের জীবনী নিয়ে শিয়ারা যেমন গ্রন্থ রচনা করেছে যেমন আল ইরশাদ ও দালায়িলুল ইমামাহ তেমনি আহলে সুন্নাতের আলেম ও মনীষীরাও বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছেন যেমন ইয়ানাবিউল মাওয়াদ্দাহ, তাযকিরাতুল খাওয়াছ।

মাকাম ও বৈশিষ্ট্যসমূহ

বার ইমামের ইমামতে বিশ্বাসের বিষয়টি বারো ইমামী শিয়াদের মৌল বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত।[১] শিয়াদের দৃষ্টিতে ইমামকে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত এবং আল্লাহর রাসূলের (আ.) মাধ্যমে ঘোষিত হতে হবে।[২] শিয়ারা বিশ্বাস করে যদিও পবিত্র কোরআনে ইমামদের নাম উল্লিখিত হয়নি কিন্তু বিভিন্ন আয়াতে যেমন উলুল আমরের আয়াত (সূরা নিসা ৫৯নং আয়াত), আয়াতে তাতহীর (সূরা আহযাব ৩৩নং আয়াত), আয়াতে বেলায়েত (সূরা মায়িদাহ ৫৫নং আয়াত), দ্বীন পূর্ণতার আয়াত (সূরা মায়িদা ৩নং আয়াত), তাবলীগের আয়াত (সূরা মায়িদাহ ৬৭নং আয়াত) এবং সত্যবাদিদের সাথে থাকার নির্দেশের আয়াত (সূরা তাওবা ১১৯নং আয়াত) তাঁদের চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যাবলী বর্ণনা করেছেন।[৩] অবশ্য রেওয়ায়েতসমূহে তাঁদের সংখ্যা ও নামসমূহ বর্ণিত হয়েছে।[৪]

শিয়ারা বিশ্বাস করে যে, ইমামরা মহানবির (সা.) ওপর আরোপিত সকল দায়িত্ব পালনের নির্দেশপ্রাপ্ত যেমন কোরআনের আয়াতের ব্যখ্যাদান, শরীয়তের বিধিবিধান বর্ণনা, সমাজের মানুষদের প্রশিক্ষিত করা, ধর্মীয় সকল প্রশ্নের জবাব দান, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান এবং ইসলামের ভূখণ্ডগত, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সীমার প্রতিরক্ষা। আল্লাহর রাসূলের (সা.) সাথে তাঁদের একমাত্র পার্থক্য হল তাঁরা ওহিপ্রাপ্ত হন না এবং স্বতন্ত্র শরীয়তের অধিকারী নন (বরং তাঁরা মহানবির (সা.) আনীত দ্বীনের রক্ষক ও নির্ভুল ব্যাখ্যাদাতা)।[৫]

বৈশিষ্ট্যসমূহ

বারো ইমামী শিয়াদের দৃষ্টিতে ইমামরা ঐশী প্রদত্ত বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তন্মধ্যে: ১. নির্ভুল হওয়া ও নিষ্পাপতা: ইমামরা সকল প্রকার ভুল-ভ্রান্তি ও পাপ থেকে মুক্ত।[৬]

২. শ্রেষ্ঠত্ব: শিয়া আলেমদের দৃষ্টিতে ইমামরা মহানবির (সা.) পর শ্রেষ্ঠ মানুষ। তাঁরা মহানবী (সা.) ছাড়া সকল নবী, ফেরেশতামণ্ডলী ও মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।[৭] এ দাবির সপক্ষে শুধু মুস্তাফিয পর্যায়ের নয় বরং মুতাওয়াতির পর্যায়ে হাদীস বিদ্যমান।[৮]

৩. গায়েবী জ্ঞান: ইমামরা আল্লাহর পক্ষ থেকে গায়েবী জ্ঞানের অধিকারী।[৯]

৪. তাকভীনি ও তাশরীয়ী বেলায়েত: অধিকাংশ শিয়া আলেম ইমামদের তাকভীনি বেলায়েতে (সৃষ্টিগত কর্তৃত্ব ও প্রভাব রাখার ক্ষমতায়) বিশ্বাসী। আর সকল শিয়া আলেম ও মনীষী ইমামদের বেলায়েতে তাশরীয়ীতে- এ অর্থে যে তাঁরা মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর কর্তৃত্বের অধিকারী- বিশ্বাসী। তাফভিয (সমর্পণ ও অধিকার দান) সম্পর্কিত রেওয়ায়েতসমূহের ভিত্তিতে ইমামদের এ অর্থেও তাশরীয়ী বেলায়েত রয়েছে যে, তাঁরা আইন প্রণয়ন ও প্রবর্তনের অধিকারপ্রাপ্ত। (তবে কখনই তাঁরা পবিত্র কোরআন ও মহানবির সুন্নাতের পরিপন্থী বিধান প্রণয়ন করেন না। তাঁরা কেবল বিভিন্ন পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে কোরআন ও সুন্নাহর সার্বিক নীতিমালার ভিত্তিতে বিধান দেন।)

৫. শাফায়াতের মর্যাদা: ইমামরা (আ.) মহানবির (সা.) শাফায়াতের মাকামের উত্তরসূরি।

৬. দ্বীনি ও জ্ঞানগত কর্তৃপক্ষ: প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহের যেমন হাদীসে সাকালাইন হাদীসে সাফিনাহ ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত যে, ইমামরা (আ.) ধর্মীয় জ্ঞানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এবং সকল মানুষের জন্য দ্বীনি বিষয়ে তাঁদের শরণাপন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক।

৬. সামাজিক নেতৃত্ব: ইমামরা মহানবির (সা.) পরে মুসলিম উম্মাহকে পরিচালনা ও নেতৃত্ব দানের দায়িত্বপ্রাপ্ত।

৭. আনুগত্য ফরজ: উলুল আমরের আয়াতের ভিত্তিতে ইমামদের আনুগত্য ফরজ। যেমনভাবে সকল মুমিনের জন্য নিঃশর্তভাবে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা ফরজ ঠিক তেমনিভাবে তাঁদের আনুগত্য করা আবশ্যক।

৮. অধিকাংশ শিয়া আলেমের দৃষ্টিতে সকল শিয়া ইমাম শাহাদাত বরণ করেছেন অথবা শহীদ হবেন। তাদের এ দাবির সপক্ষে বেশ কিছু রেওয়ায়েত রয়েছে তন্মধ্যে এ রেওয়ায়েতটি প্রসিদ্ধ যে, ‘আল্লাহর শপথ, আমাদের সকলেই নিহত ও শহীদ হব।’ এগুলোর ভিত্তিতে বলা যায় ইমামরা সবাই শহীদ হবেন।

ইমামদের ইমামতের সময়কাল

ইমাম আলী (আ.) [১১-৪০ হিজরী] ইমাম হাসান (আ.) [৪০-৫০ হিজরী] ইমাম হোসাইন (আ.) [৫০-৬১ হিজরী] ইমাম সাজ্জাদ (আ.) [৬১-৯৪ হিজরী] ইমাম বাকির (আ.) [৯৪-১১৪ হিজরী] ইমাম সাদিক (আ.) [১১৪-১৪৮ হিজরী] ইমাম কাযিম (আ.) [১৪৮-১৮৩ হিজরী] ইমাম রেজা (আ.) [১৮৩-২০৩ হিজরী] ইমাম জাওয়াদ (আ.) [২০৩-২২০ হিজরী] ইমাম হাদী (আ.) [২২০-২৫৪ হিজরী] ইমাম আসকারী (আ.) [২৫৪-২৬০ হিজরী] ইমাম মাহদী (আ.) [২৬০ হিজরী- এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে]

শিয়া ইমামদের ইমামতের দলীল

শিয়া আলেমরা বার ইমামের ইমামতের সপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক যেমন ইমামদের মাসুম (নির্ভুল ও নিষ্পাপ) হওয়া ও অন্যদের ওপর সবক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতার দলীল এবং নাকলী (হাদীসভিত্তিক) দলীল যেমন জাবির বিন আবদুল্লাহ আনসারির হাদীস, লাওহের হাদীস [যে হাদীসে ফলক রাসূল (সা.) হযরত ফাতেমাকে উপহার দিয়েছিলেন ও তাতে ইমামদের নাম ও পরিচয় লেখা ছিল] ও বার খলিফার হাদীস।

জাবির বিন আবদুল্লাহ আনসারির হাদীস

«يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهه وَ أَطِيعُوا الرَّسُولَ وَ أُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ» -আয়াতটি অবতীর্ণ হলে সাহাবী জাবির বিন আবদুল্লাহ আনসারী মহানবীর (সা.) কাছে আয়াতে উল্লিখিত ‘উলুল আমর কারা?’ এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি (সা.) বলেন, ‘তারা হলেন আমার স্থলাভিষিক্ত এবং আমার পর মুসলমানদের ইমাম ও নেতা। তাদের প্রথম হল আলী। তারপর পর্যায়ক্রমে ইমাম হল হাসান ইবনে আলী, হোসাইন ইবনে আলী, আলী ইবনে হোসাইন, মুহাম্মাদ ইবনে আলী, জাফর ইবনে মুহাম্মাদ, মুসা ইবনে জাফর, আলী ইবনে মুসা, মুহাম্মাদ ইবনে আলী, আলী ইবনে মুহাম্মাদ, হাসান ইবনে আলী এবং তারপর হল তার সন্তান যার নাম ও কুনিয়া (ডাকনাম) হল আমার নামে…। মহানবির (সা.) প্রশংসায় আবদুর রহমান জামী’র কবিতার এক পঙতি ক্যালিওগ্রাফি করা হয়েছে যার কেন্দ্রে আরবি ‘তা’ অক্ষরের মধ্যে শিয়া বার ইমামের নাম খচিত হয়েছে। এ ক্যালিওগ্রাফিটি হোসাইন যাররিন কালাম লিখেছেন যাতে তিনি গোলযার লিখন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

বার খলিফার হাদীস

আহলে সুন্নাতের সূত্রে মহানবি (সা.) থেকে বর্ণিত অনেক রেওয়ায়েতে তাঁর পর বারোজন খলিফার আগমনের কথা বলা হয়েছে যারা সকলেই কুরাইশ বংশ থেকে হবেন। জাবির বিন সামুরাহ রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন: ‘এ দ্বীন কিয়ামত পর্যন্ত, যতক্ষণ না বারো জন খলিফা তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবেন, বহাল থাকবে। এ খলিফারা সবাই কুরাইশ বশোদ্ভূত হবেন। তেমনি অন্য হাদীসে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ সূত্রে রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তাদের সংখ্যা বনি ইসরাইলের নকিবদের সমান। আহলে সুন্নাতের হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ আলেম সুলাইমান ইবনে ইবরাহিম কুন্দুযি বলেছেন যে, রাসূলের এ হাদীসে উল্লিখিত বারোজন খলিফা হলেন শিয়াদের মধ্যে প্রচলিত বারোজন ইমাম। কারণ তাঁরা ব্যতিত অন্য কারো ওপর তা প্রয়োগ করা যায় না।

ইমামদের পরিচয়

বারো ইমামী শিয়ারা বিভিন্ন আকলী (বুদ্ধিবৃত্তিক) ও নাকলী (হাদীসগত) দলীলের যেমন মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত গাদীরের হাদীস ও মানযিলাতের হাদীসের ভিত্তিতে বিশ্বাস করে মহানবির(সা.) পরপরই তাঁর স্থলাভিষিক্ত প্রকৃত উত্তরাধিকারী ও খলিফা হলেন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)। হযরত আলীর পর পর্যায়ক্রমে ইমাম হাসান ইবনে আলী, হোসাইন ইবনে আলী, আলী ইবনে হোসাইন, মুহাম্মাদ ইবনে আলী, জাফর ইবনে মুহাম্মাদ, মুসা ইবনে জাফর, আলী ইবনে মুসা, মুহাম্মাদ ইবনে আলী, আলী ইবনে মুহাম্মাদ, হাসান ইবনে আলী এবং মাহদী মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বভার গ্রহণ করবেন।

ইমাম আলী (আ.)

আলী ইবনে আবি তালিব, ইমাম আলী (আ.) নামে প্রসিদ্ধ ও তাঁর উপাধি হল আমিরুল মুমিনীন, শিয়াদের প্রথম ইমাম। তিনি হযরত আবু তালিব ও ফাতেমা বিনতে আসাদের সন্তান এবং ৩০ হস্তী বছরের (আবরাহার বাহিনী মক্কায় হামলার ৩০তম বছরে) ১৩ রজবে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। হযরত আলী প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি শিশুকাল থেকে সবসময় মহানবির (সা.) সান্নিধ্যে থাকতেন এবং তাঁর কন্যা ফাতেমাকে (আ.) বিয়ে করেন।

যদিও মহানবী (সা.) গাদীরের দিবস ছাড়াও অসংখ্যবার হযরত আলীকে (আ.) নিজের পরবর্তী স্থলাভিষিক্ত হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন তবুও তাঁর ইন্তেকালের পর সকিফায়ে বনি সায়েদায় ভিন্ন এক প্রক্রিয়ায় আবু বকর ইবনে আবি কোহাফা মুসলমানদের খলিফা হন। আলী (আ.) মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বৃহত্তর স্বার্থের (কল্যাণের) কথা চিন্তা করে খেলাফত হস্তগত করার জন্য কোনরূপ সশস্ত্র সংগ্রামে না গিয়ে ২৫ বছর যাবৎ (প্রথশ তিন খলিফার সময়কালে) ধৈর্য ধারণ করেন। অতঃপর ৩৫ হিজরী সালে মুসলমানরা তাঁর সাথে খলিফা হিসাবে বাইয়াত করেন। তাঁর খেলাফতের মেয়াদ চার বছর ও নয় মাস ছিল। এ সীমিত কয়েক বছরে তাঁর ওপর তিনটি যুদ্ধ (জামালের যুদ্ধ, সিফফিনের যুদ্ধ ও নাহরাওয়ানের যুদ্ধ) চাপিয়ে দেয়া হয়। ফলে তাঁকে তাঁর খেলাফতের অধিকাংশ সময় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ নিরসনের জন্য ব্যস্ত থাকতে হয়।

ইমাম আলী (আ.) ৪০ হিজরী সালের ১৯ রমজান ফজরের নামাজের সময় মসজিদে কুফার ইবনে মুলজিম মুরাদির তরবারির আঘাতে গুরুতর আহত হন। এ আঘাতের ফলে তিনি ২১ রমজান শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর তাঁকে নাজাফে দাফন করা হয়। তিনি অসংখ্য ফজিলত ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর শানে (প্রশংসায়) পবিত্র কোরআনের ৩০০ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। ইবনে আব্বাস আরো বর্ণনা করেছেন যে, কোরআনে যেখানেই «یا أیها الذین آمنوا» (হে যারা ইমান এনেছো) বলা হয়েছে তার শীর্ষে হযরত আলী (আ.) রয়েছেন এবং তিনি তাদের নেতা।

ইমাম হাসান মুজতাবা

হাসান ইবনে আলী (আ.), ইমাম হাসান মুজতাবা নামে প্রসিদ্ধ, ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতেমার (আ.) প্রথম সন্তান। তিনি ৩য় হিজরির ১৫ রমজানে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। ইমাম হাসান তাঁর পিতার শাহাদাতের পর মহান আল্লাহর নির্দেশে ও স্বীয় পিতার ওসিয়ত অনুযায়ী ইমামতের পদ গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর ইমামতের প্রথম ছয় মাস মুসরমানদের খলিফা হিসাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর খেলাফতের সময় মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ইরাকে হামলা চালায়। ইমাম হাসান (আ.) তাকে প্রতিরোধের পদক্ষেপ নিলে সে তাঁর সেনাপতিদের প্রতারিত করে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে এবং তাদের একদলকে প্রলোভন দেখিয়ে নিজের দলে ভিড়ায়। ফলে ইমাম হাসান নিরুপায় হয়ে মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধি করেন। তিনি শর্তসাপেক্ষে (মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর পুনরায় খেলাফতকে ইমাম হাসানের হাতে অর্পিত হবে এবং কোন অবস্থাতেই যেন নবী পরিবারের সদস্য ও শিয়াদের নির্যাতন করা না হয়) খেলাফতের পদকে মুয়াবিয়ার হাতে ছেড়ে দেন। ইমাম হাসান ১০ বছর ইমামতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ৫০ হিজরির ২৮ সফরে মুয়াবিয়ার প্ররোচনায় তারঁ স্ত্রীর (জো’দাহ বিনতে আশআসের) দেয়া বিষ পানে শহীদ হন। তাঁকে বাকি কবরস্থানে দাফন করা হয়। ইমাম হাসান (আ.) আসহাবে কিসার সদস্য (রাসূলের সাথে কিসার নিচে স্থান লাভকারীদের অন্যতম) এবং খ্রিস্টানদের সাথে মুবাহিলায় অংশগ্রহণকারী মহানবির আহলে বাইতের - যাদের ব্যাপারে আয়াতে তাতহীর (সূরা আহযাবের ৩৩ নং আয়াতের শেষাংশ) অবতীর্ণ হয়েছে- অন্যতম সদস্য।

ইমাম হোসাইন (আ.)

হোসাইন ইবনে আলী (আ.), আবা আবদিল্লাহ ও সাইয়েদুশ শুহাদা নামে প্রসিদ্ধ, শিয়াদের তৃতীয় ইমাম। তিনি হযরত আলী (আ.) ও ফাতেমার (আ.) দ্বিতীয় সন্তান। তিনি চতুর্থ হিজরির শাবান মাসের ৩ তারিখে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। ইমাম হোসাইন (আ.) আল্লাহর রাসূলের স্পষ্ট নির্দেশ এবং পিতার আলীর (আ.) ওসিয়ত অনুসারে স্বীয় ভ্রাতা ইমাম হাসানের মৃত্যুর পর ইমামতের পদ গ্রহণ করেন।

ইমাম হোসাইন (আ.) দশ বছর ইমামতের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ইমামতকালের শেষ ছয় মাস ব্যতীত বাকি সময় মুয়াবিয়ার শাসনকাল ছিল। মুয়াবিয়া ৬০ হিজরী সালে মুত্যুবরণ করে এবং তার পুত্র তার স্থলাভিষিক্ত হয়। ইয়াযিদ ক্ষমতা গ্রহণের পর ইমাম হোসাইন থেকে বাইয়াত নেয়ার জন্য মদীনার গভর্নরকে নির্দেশ দেয়। মদীনার গভর্নর ইমাম হোসাইনকে বিষয়টি জানালে তিনি বাইয়াত না করে রাতে স্বীয় পরিবার নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হন। তিনি মক্কায় অবস্থানকালে কুফার জনগণের দাওয়াত পেয়ে পরিবারর সদস্য ও সঙ্গীদের নিয়ে কুফার দিকে যাত্রা করেন। কুফায় পৌঁছার পূর্বেই তাঁকে তাঁর সঙ্গীদের সহ কারবালায় অবরুদ্ধ করা হয় এবং ১০ মুহাররামে উমর ইবনে সাদের নেতৃত্বে পরিচালিত ইয়াযিদের সেনাদের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হতে বাধ্য হন। এ যুদ্ধে তিনি ও তাঁর সঙ্গীগণ এবং পরিবারের পুরুষ সদস্যরা শহীদ হন। অতঃপর তাঁর সন্তান ইমাম সাজ্জাদ ও নারিরা ইয়াযিদ বাহিনীর হাতে বন্দী হন। ইমাম হোসাইন (আ.) আসহাবে কিসার অন্যতম সদস্য এবং মুবাহালার ঘটনায় অংশগ্রহণকারী আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। যাদের শানে আয়াতে তাতহীর অবতীর্ণ হয়েছে তিনি তাঁদের পঞ্চম ব্যক্তি।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)

আলী ইবনে হোসাইন (আ.), উপাধি সাজ্জাদ ও যাইনুল আবেদীন, শিয়াদের চতুর্থ ইমাম। তিনি হোসাইন ও শাহরবানুর (তৃতীয় ইয়াযদ গার্দের কন্যা) সন্তান এবং ৩৮ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেছেন।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) কারবালার ঘটনায় বন্দী হন এবংতাঁকে কারবালার অন্যান্য বন্দীদের সাথে কুফা ও শামে (সিরিয়া) নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি দামেস্কে নিজের ও তাঁর মহান পিতৃবর্গের পরিচয় তুলে ধরে একটি বক্তব্য রাখেন যা সকলকে প্রভাবিত করে। তিনি বন্দীদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর পরিবারসহ মদীনায় ফিরে আসেন। মদীনায় তিনি অধিকাংশ সময় ইবাদতে রত থাকতেন এবং শিয়াদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যেমন আবু হামযাহ সিমালি ও আবু খালেদ কাবুলী ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রাখতেন না। আর এই বিশেষ ব্যক্তিরা তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করে শিয়াদের মধ্যে প্রচার করতেন। ইমাম সাজ্জাদ ৩৪ বছর ইমামতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ৯৫ হিজরিতে ৫৭ বছর বয়সে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের দ্বারা বিষপ্রয়োগে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে তাঁর চাচা ইমাম হাসানের পাশে দাফন করা হয়। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) থেকে দোয়াসমগ্র ও মুনাজাতসমূহ বর্ণিত হয়েছে যেগুলো দ্বীনের অনেক মূল্যবান জ্ঞান সম্বলিত। তাঁর দোয়াগুচ্ছ সাহিফায়ে সাজ্জাদিয়া গ্রন্থে স্কলিত হয়েছে।

ইমাম বাকির (আ.)

মুহাম্মাদ ইবনে আলী (আ.), ইমাম মুহাম্মাদ বাকির নামে প্রসিদ্ধ, শিয়াদের পঞ্চম ইমাম। তিনি ইমাম সাজ্জাদ ও ফাতেমা বিনতে হাসানের পুত্র। তাঁর জন্ম ৫৭ হিজরিতে মদীনায় হয়েছে। তিনি তাঁর পিতার পর আল্লাহর নির্দেশ ও তাঁর পূর্ববর্তী ইমামদের ওসিয়তে ইমামতের পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি ১১৪ হিজরিতে উমাইয়া খলিফা হিশামের ভ্রাতুষ্পুত্র ইবরাহিম ইবনে ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের দ্বারা বিষপ্রয়োগে শহীদ হন।

তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে তাঁর পিতার পাশে দাফন করা হয়। ইমাম বাকির (আ.) কারবালায় উপস্থিত ছিলেন এবং সেসময় তাঁর বয়স চার বছর ছিল।

ইমাম বাকিরের ইমামতকাল ১৮ বা ১৯ বছর ছিল। একদিকে এ সময়ে বনি উমাইয়ার জুলুম ও নিপীড়নের প্রতিবাদে একের পর এক বিদ্রোহ ও আন্দোলন হচ্ছিল। বনি উমাইয়া এসব আন্দোলন দমনে ব্যতিব্যস্ত থাকায় আহলে বাইতের প্রতি কঠোরতা আরোপের সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে কারবালার ঘটনা এবং আহলে বাইতের মজলুম ও অত্যাচারিত হওয়ার বিষয়টি মুসলমানদের দৃষ্টিকে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করে। এ পরিস্থিতি তাঁর জন্য আহলে বাইতের শিক্ষা ও ইসলামের প্রকৃত জ্ঞানকে প্রচারেরে এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। তাঁর পূর্ববর্তী ইমামদের পক্ষে এরূপ করা সম্ভব ছিল না। এ কারণেই ইমাম বাকির থেকে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। শেখ মুফিদের মতে ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত অধিক যে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনের সন্তানদের অন্য কারো থেকেই এত পরিমাণ হাদীস বর্ণিত হয়নি।

এই নিবন্ধটি আপডেট হবে....।

  1. মুহাম্মাদী, শারহে কাশফুল মুরাদ, ১৩৭৮ সৌরবর্ষ, পৃ. ৪০৩; মুসাভি যানজানী, আকায়েদুল ইমামিয়াতিল ইসনা আশারিয়াহ, ১৪১৩ হি., খণ্ড ৩, পৃ. ১৭৮।
  2. মুহাম্মাদী, শারহে কাশফুল মুরাদ, প্রকাশকাল ১৩৭৮ সৌরবর্ষ, পৃ. ৪২৫; মুসাভি যানজানী, আকায়েদুল ইমামিয়াতিল ইসনা আশারিয়াহ, ১৪১৩ হি., খণ্ড ৩, পৃ. ১৮১ ও ১৮২।
  3. দ্রষ্টব্য: মাকারেম শিরাজী, পায়ামে কুরআন, প্রকাশকাল ১৩৮৬ সৌরবর্ষ, খণ্ড ৯, পৃ. ১৭০ ও১৭১ এবং ৩৬৯ ও ৩৭০।
  4. দ্রষ্টব্য: হাকিম, আল-ইমামাহ ওয়া আহলুল বাইত, প্রকাশকাল ১৪২৪, পৃ. ৩০৫-৩৩৮।
  5. সুবহানী, মানশুরু আকায়িদিল ইমামিয়াহ, প্রকাশকাল ১৩৭৬, পৃ ১৬৫ ও ১৬৬।
  6. দেখুন: আল্লামা হিল্লী, কাশফুল মুরাদ, প্রকাশকাল ১৩৮২ সৌর বর্ষ, পৃ. ১৮৪; ফাইয়ায লাহিজী, সারমায়ে-এ ঈমান দার উসুলে এ'তেকাদাত, প্রকাশকাল ১৩৭২, পৃ. ১১৪ ও ১১৫।
  7. দেখুন: সাদুক, আল-এ'তেকাদাত, প্রকাশকাল ১৪১৪ হি., পৃ. ৯৩; মুফীদ, আওয়ায়েলুল মাকালাত, ১৪১৩ হি. পৃ. ৭০ ও ৭১।
  8. মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ১৪০৩ হি., খণ্ড ২৬, পৃ. ২৯৭; শুব্বার, হাক্কুল ইয়াকীন, ১৪২৪ হি. পৃ. ১৪৯।
  9. দেখুন: কুলাইনী, আল-কাফী, ১৪০৭ হি., খণ্ড ১, পৃ. ২৫৫ ও ২৫৬ এবং ২৬০ ও ২৬১; সুবহানী ইলমে গেইব, প্রকাশকাল ১৩৮৬ সৌরবর্ষ, পৃ.৬৩-৭৯।