হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি

wikishia থেকে

হযরত মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম (আমুল ফীল থেকে ১১ হি.), ইসলামের নবি, উলুল আযম নবিগণের (আ.) অন্যতম এবং মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি। তাঁর প্রধান মুজিযা হল কুরআন।

মহানবি হযরত মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম) আরব উপদ্বীপে মক্কার মুশরিক সমাজে জন্মগ্রহণ করলেও কখনও তিনি মূর্তিপূজা করেননি। ৪০ বছর বয়সে নবুয়্যতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তাওহিদের (একত্ববাদ) প্রতি আহবান ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বার্তা। তাঁকে প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের নৈতিক দিকের পূর্ণতা দান করা। বহুবছর যাবত মক্কার মুশরিকরা তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালালেও তারা ইসলাম থেকে সরে দাঁড়াননি। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) দীর্ঘ ১৩ বছর মক্কায় লোকদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানানোর পর মদিনায় হিজরত করেন। আর এ হিজরতের ঘটনা ছিল ইসলামি পঞ্জিকার সূচনা। মহানবির (সা.) আপ্রাণ চেষ্টায় আরব উপদ্বীপের প্রায় সকল এলাকা তাঁর জীবদ্দশাতেই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। পরবর্তীতে সম্প্রসারিত হয়ে আস্তে আস্তে দ্বীন-এ ইসলাম বিশ্বজনীন ধর্মে পরিণত হয়।

হাদীসে সাকালাইনের ভিত্তিতে, মহানবির (সা.) পর তাঁর অবর্তমানে কুরআন ও ইতরাতের (তাঁর আহলে বাইত) শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়ে তিনি মুসলমানদেরকে জোর তাগিদ দিয়েছেন। আর তাদেরকে বলেছেন যেন তারা এ দু’টি থেকে কখনও বিচ্ছিন্ন না হয়। তিনি (সা.) গাদীরে খুমের ঘটনাসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে হযরত আলীকে (আলাইহিস সালাম) নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে পরিচয় করিয়েছেন।

মহানবি (সা.) ২৫ বছর বয়সে হযরত খাদিজার (সালামুল্লাহ আলাইহা) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল ২৫ বছরের। হযরত খাদিজার ওফাতের পর মহানবি (সা.) পূনরায় বিবাহ করেন। হযরত খাদিজা ও হযরত মারিয়া থেকে মহানবি (সা.) কয়েকজন সন্তানের পিতা হলেও হযরত ফাতেমা (সা. আ.) ছাড়াই বাকিরা সবাই তাঁর জীবদ্দশাতেই ইন্তিকাল করেন।

বংশ পরিচয়, কুনিয়াহ ও উপাধিসমূহ

হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আব্দে মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে কালাবের[[১]] পুত্র। তাঁর সম্মানিত মাতা হলেন আমিনাহ বিনতে ওয়াহাব। বিশিষ্ট শিয়া মনীষী আল্লামা মাজলিসীর ভাষ্যানুযায়ী, আল্লাহর রাসূলের (সা.) পিতামাতা এবং হযরত আদম (আ.) পর্যন্ত তাঁর পূর্বপুরুষের সকলের মু’মিন হওয়া ও ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার বিষয়ে ইমামিয়া শিয়াগণের ইজমা রয়েছে।[২]

তাঁর কুনিয়াহ ও উপাধিসমূহ

মহানবির (সা.) কুনিয়াহ হল আবুল কাসিম ও আবু ইব্রাহিম।[৩] আর তাঁর উপাধিগুলোর মধ্যে মুস্তাফা, হাবিবুল্লাহ, সাফিউল্লাহ, নি’মাতুল্লাহ, খিয়ারাতু খালকিল্লাহ, সাইয়্যিদুল মুরসালিন, খাতামুন নাবিয়্যিন, রাহমাতুল লিল আলামিন, নাবিয়্যুল উম্মি।[৪]

জন্ম

শিয়া উলামাদের প্রসিদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গী হল তাঁর জন্ম তারিখ ১৭ রবিউল আওয়াল। পক্ষান্তরে সুন্নি আলেমদের মাঝে প্রসিদ্ধ হল তিনি ১২ রবিউল আওয়াল জন্ম গ্রহণ করেছেন।[৫] মুসলিম উম্মাহ’র মধ্যকার ঐক্যকে অটুট রাখতে এ দুই তারিখের মাঝের দিনগুলোকে ‘ইসলামি ঐক্য সপ্তাহ’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।[৬]

আল্লামা মাজলিসী বলেছেন, বেশীরভাগ শিয়া আলেমের মতে মহানবির (সা.) জন্ম তারিখ হল ১৭ রবিউল আওয়াল।[৭] অবশ্য কিছু কিছু শিয়া আলেম তাঁর জন্ম তারিখ ১২ রবিউল আওয়াল বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে ১২ রবিউল আওয়াল তারিখ প্রসঙ্গে আল্লামা মাজলিসী’র বিশ্লেষণ হল: ১২ রবিউল আওয়াল হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্ম বলে যে মত রয়েছে তা মূলতঃ তাকিয়্যাহগত কারণে।[৮] আবার এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, ((لإثنتی عشر لیلة بقیت من شهر ربیع الاول)) বাক্যটিতে ((بقیت)) (অবশিষ্ট) শব্দটির স্থলে ভুলক্রমে ((مَضَت)) (অতিক্রান্ত) শব্দটি উল্লেখিত হয়েছে।[সূত্র] যেভাবে খতিব কাস্তালানী’র বর্ণনায় ((بقیت)) শব্দটি এসেছে।[৯] মহানবির (সা.) জন্ম তারিখ নিয়ে সুন্নি আলেমগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ তাঁর জন্ম আমুল ফীলে (হস্তিবর্ষে)[১০] বলে উল্লেখ করেছেন। আবার কারো কারো মতে আমুল ফীলের ১০ বছর পর।[[১১]] আর যেহেতু মহানবি (সা.) ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ৬৩ বছর বয়সে ওফাত লাভ করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে তাই আমুল ফীল ৫৬৯-৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝে হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।[১২] মহানবির (সা.) জন্মের দিনের বিষয়ে আহলে সুন্নাতের মাঝে ব্যাপক মতভেদ পরিলক্ষিত; যেগুলোর মধ্যে ১২ রবিউল আওয়াল,[১৩] ২ রবিউল আওয়াল,[১৪] ৮ রবিউল আওয়াল,[১৫] ১০ রবিউল আওয়াল ও [[১৬] রমজান মাসে[১৭] ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

জন্মস্থান

মহানবি (সা.) শি’বে আবি তালিবে[১৮] অবস্থিত একটি গৃহে জন্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে যা আকীল ইবনে আবি তালিবের তত্ত্বাবধানে ছিল। আকীলের সন্তানরা ঐ ঘরটিকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভাই মুহাম্মাদ বিন ইউসুফের কাছে বিক্রি করে দেয়।[১৯] সে ঐ স্থানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করে। বনি আব্বাসের শাসনামলে আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রাশিদের মা আল-খাইযুরান ঐ ঘরটি ক্রয় করে তা মসজিদে রূপান্তরিত করেন।[২০] ১১ শতাব্দির বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আল্লামা মাজলিসী বলেছেন: তার সময় এ নামে মক্কায় একটি স্থান ছিল এবং মানুষ ঐ স্থানটির যেয়ারতে যেত।[২১] আলে সউদের শাসনামল পর্যন্ত ঐ স্থাপনা অবশিষ্ট ছিল কিন্তু ওয়াহাবি আকিদা অনুযায়ী নবিগণের (আ.) সাথে সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে বরকত নেয়া নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা ঐ স্থানটি ধ্বংস ভেঙ্গে ফেলে।[২২][নোট ১]

মহানবির (সা.) জন্মের রাতের অলৌকিক ঘটনাবলি

মহানবির (সা.) জন্মের রাতে বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল যেগুলো ‘ইহরাসাত’ নামে প্রসিদ্ধ।[২৩] ঐ রাতে পারস্যের সম্রাটের বিশাল প্রাসাদের বারান্দা কেঁপে ওঠে এবং ছাদের ১৪টি প্রাচীর ধ্বসে পড়ে, ১০০০ বছর ধরে প্রজ্বলিত পারস্যের অগ্নি উপাসনালয়ের আগুন নিভে যায়, পারস্যের সাভে হ্রদ শুকিয়ে যায়, হিজাজ থেকে একটি আলো দৃশ্যমান হয় যা পূর্বাঞ্চলসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, অগ্নি উপাসকদের ধর্মযাজক ও সাসানি বাদশাহ দুঃস্বপ্ন দেখেন ইত্যাদি।[২৪]

নবুয়্যত ঘোষণার পূর্বের ঘটনাপ্রবাহ

হযরত মুহাম্মাদের (সা.) সম্মানিত পিতা হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব তাঁর মাতা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের সাথে বিবাহের কয়েক মাস পর এক বাণিজ্যিক সফরে সিরিয়ায় যান এবং মক্কায় ফেরার পথে ইয়াসরিবে ইন্তেকাল করেন। কিছু কিছু ঐতিহাসিক বিবাহের কয়েকমাস পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন বলে লিখেছেন। বনি সায়াদাহ গোত্রের হালীমাহ্ মুহাম্মাদকে (সা.) কিছুকাল স্তন্যদান করেছিলেন এবং শৈশবের কয়েকটি বছরও তার তত্ত্বাবধানে তিনি ছিলেন। তাঁর বয়স যখন ৬ বছর ৪ মাস (মতান্তরে ৪ বছর) তাঁর মা তাঁকে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের (আব্দুল মুত্তালিবের মায়ের দিক থেকে বনি আদি বিন নাজ্জার গোত্রের) সাথে দেখা করতে ইয়াসরিব নিয়ে যান। কিন্তু মক্কা ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে তিনিও ইন্তিকাল করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।[১] মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর (সা.) দাদা হযরত আব্দুল মুত্তালিব তাঁর ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। ৮ বছর বয়সে নিজ দাদা হযরত আব্দুল মুত্তালিবকে হারালে তাঁর দায়িত্ব চাচা হযরত আবু তালিবের উপর অর্পিত হয়।[২৫]

হযরত মুহাম্মাদের (সা.) জীবনীর বেশীরভাগ প্রেক্ষাপটের বিভিন্ন ঘটনাবলি ইতিহাস গ্রন্থসমূহে সবিস্তারে উল্লিখিত হয়েছে; অপর নবিগণের (আ.) তুলনায় তাঁর জীবনী অধিক পূর্ণরূপে সংরক্ষিত ও লিপিবদ্ধ হয়েছে। এতদসত্ত্বেও তাঁর জীবনের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় এখনও অজানা রয়ে গেছে।[সূত্র প্রয়োজন]

প্রথম শামদেশ সফর ও খ্রিষ্টান পাদ্রীর ভবিষ্যদ্বাণী

মহানবি (সা.) কৈশোরে চাচার শামদেশে (সিরিয়া) বাণিজ্যিক সফরে তার সাথে ছিলেন। এ সফরে ‘বাহিরা’ নামক জনৈক খ্রিষ্টান পাদ্রী তাঁর (সা.) মাঝে নবুয়্যতের চিহ্ন দেখতে পেয়ে হযরত আবু তালিবকে বলেন যেন তাঁকে ইহুদিদের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখেন, কারণ ইহুদিরা তাঁর শত্রু।[২৬]

শামদেশে দ্বিতীয় সফর

হযরত মুহাম্মাদের (সা.) বয়স যখন ২৫ বছর হযরত আবু তালিব তাকে হযরত খাদিজা’র মূলধন নিয়ে ব্যবসার পরামর্শ দেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনার ভিত্তিতে ততদিনে মহানবির (সা.) আমানতদারী সম্পর্কে হযরত খাদিজা জেনে গিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি তাঁকে (সা.) এ মর্মে বার্তা পাঠালেন যে, যদি তিনি (সা.) তার মূলধন নিয়ে ব্যবসা করেন তবে অন্যদের তুলনায় বেশী অংশ প্রদান করবেন।[২৭] সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফর থেকে ফিরে তিনি হযরত খাদিজা’র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

হিলফুল ফুযুল

বিবাহের আগে মহানবি (সা.) হিলফুল ফুজুল (প্রতিজ্ঞা-সংঘ) চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেন। ঐ চুক্তিতে একদল মক্কাবাসী অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় যে, তারা যেকোন নিপীড়িত ও অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে এবং তার অধিকার আদায় করে দেবে।[২৮]

মহানবির (সা.) বিবাহ

মহানবি (সা.) ২৫ বছর বয়সে হযরত খাদিজার (সা. আ.) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।[২৯] হযরত খাদিজা ছিলেন তাঁর (সা.) প্রথম স্ত্রী[৩০] এবং তাদের দাম্পত্য জীবন ছিল ২৫ বছরের। হযরত খাদিজা নবুয়্যতের ১০ম বছরের ইন্তিকাল করেন। তার ইন্তেকালের পর মহানবি (সা.) সাওদা বিনতে যামআ বিন কায়েসকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তিনি যাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তারা হলেন: আয়েশা, হাফসা, যায়নাব বিনতে খুযাইমা বিন হারেস, উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান, উম্মে সালামাহ, যায়নাব বিনতে জাহেশ, জুওয়াইরিয়া বিনতে হারেস, সাফিয়া বিনতে হুইয়াই বিন আখতাব, মাইমুনাহ বিনতে হারেস বিন হুযন ও মারিয়া বিনতে শামউন।[৩১]

মহানবি (সা.)-এর স্ত্রীগণ ও বিবাহের বছর

  • খাদিজা বিনতে খোওয়াইলাদ (আমুল ফীলের ২৫তম বছরে)
  • সাওদা বিনতে যামআহ (হিজরতের আগে)
  • আয়েশা বিনতে আবু বকর (১ বা ২ অথবা ৪র্থ হিজরী)
  • হাফসাহ বিনতে উমার ইবনে খাত্তাব (৩য় হিজরী)
  • যায়নাব বিনতে খুযাইমাহ (৩য় হিজরী)
  • উম্মু সালামাহ বিনতে আবু উমাইয়া (৪র্থ হিজরী)
  • যায়নাব বিনতে জাহেশ (৫ম হিজরী)
  • জুওয়াইরিয়া বিনতে হারেস (৫ বা ৬ হিজরী)
  • উম্মু হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান (৬ বা ৭ হিজরী)
  • মারিয়া বিনতে শামউন (৭ম হিজরী)
  • সাফিয়া বিনতে হুইয়াই (৭ম হিজরী)
  • মাইমুনাহ বিনতে হারেস (৭ম হিজরী)

সন্তানগণ

হযরত ইবাহিম (আ.) ব্যতীত আল্লাহর রাসূলের (সা.) সকল সন্তানের মা ছিলেন হযরত খাদিজা (সা. আ.); ইব্রাহিমের মা ছিলেন হযরত মারিয়া কিবতিয়াহ। হযরত ফাতেমা (সা. আ.) ব্যতীত তাঁর সকল সন্তান তাঁর জীবদ্দশাতেই ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর (সা.) বংশধারা হযরত ফাতেমার (সা. আ.) মাধ্যমেই অব্যাহত রয়েছে। তিনি (সা.) ৩ কন্যা ও ৪ পুত্রের জনক ছিলেন:

  • কাসেম; মহানবি (সা.)-এর প্রথম পুত্র, তিনি শৈশবে মক্কায় ইন্তেকাল করেন।
  • যায়নাব; ৮ম হিজরীতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।
  • রুকাইয়া; ২য় হিজরীতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।
  • উম্মু কলুসুম; ৯ম হিজরীতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।
  • হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) ১১ হিজরীতে মদিনায় শহীদ হন এবং আল্লাহর রাসূলের (সা.) বংশধারা তার মাধ্যমেই অব্যাহত রয়েছে।
  • আব্দুল্লাহ; নবুয়্যত ঘোষণার পর মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
  • ইব্রাহিম; ১০ম হিজরীতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।[৩২]

হিজরী ৪র্থ শতাব্দির বিশিষ্ট শিয়া আলেম আবুল কাসেম কুফি ও হিজরী পঞ্চদশ শতাব্দির বিশিষ্ট শিয়া গবেষক সাইয়্যেদ জাফার মুর্তাজা আমেলির মতে যায়নাব, রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুম মহানবি (সা.) ও হযরত খাদিজা দম্পত্তির সন্তান নন, বরং তারা ছিলেন পালিত সন্তান।[৩৩]

হাজারুল আসওয়াদ স্থাপনের ঘটনা

জাহিলিয়্যাতের যুগে একবার কা’বার অভ্যন্তরে পানি প্রবেশের কারণে এর দেওয়ালেও ফাঁটলের সৃষ্টি হয়। কুরাইশ কা’বার দেয়াল সংস্কার করার পর ‘হাজারুল আসওয়াদ’ স্থাপনের বিষয়ে গোত্রপতিদের মাঝে বিপত্তি বাধে; কে এই পবিত্র ও সম্মানিত পাথর স্বস্থানে স্থাপন করবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হল। সকল গোত্রের প্রধানই চাচ্ছিল এ সৌভাগ্য যেন তার নসীবে জোটে। গোত্রপতিরা রক্তপূর্ণ পাত্র এনে তাতে হাত ডুবিয়ে নিল; এ ছিল এক প্রকার কসম ও অঙ্গীকার এর ফলে বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত যুদ্ধ করতে হত। অবশেষে তারা এ সমাধানে পৌঁছাল এবং সবাই তা মেনেও নিল যে, প্রথম যে ব্যক্তি ‘বনি শাইবা’ দরজা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করবে সে যে সমাধান দেবে তা সবাইকে মানতে হবে। মহানবি (সা.) মসজিদে প্রবেশ করলেন। তারা মহানবির (সা.) সিদ্ধান্ত মেনে নিল। মহানবি (সা.)-এর নির্দেশে একটি কাপড়ের মাঝখানে হাজারুল আসওয়াদ রাখা হল এবং সকল গোত্র প্রধানরা ঐ কাপড়ের একেকটি পাশ ধরে কাপড়টি উঁচু করল, আর মহানবি (সা.) নিজের হাত মোবারক দিয়ে হাজারুল আসওয়াদকে স্বস্থানে স্থাপন করলেন।[৩৪]

নবুয়্যত ঘোষণা (বে’সাত)

ইমামিয়াগণের মাঝে প্রসিদ্ধ হল মহানবির (সা.) নবুয়্যত ঘোষণার দিনটি ছিল ২৭শে রজব।[৩৫] হেরা গুহা’তে তিনি (সা.) ইবাদতরত অবস্থায় থাকাকালে হযরত জীবরাইল আগমন করেন এবং তার নবুয়্যতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কথা জানান। বে’সাতের (নবুয়্যত ঘোষণা) কাছাকাছির বছরগুলোতে প্রতিবছর তিনি লোকালয় থেকে দূরে এক মাসের জন্য হেরা গুহাতে মহান আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হতেন।[৩৬] এ সম্পর্কে তিনি বলেন: জীবরাইল আমার কাছে এসে বলল: পড়! আমি বললাম: আমি পড়তে পারি না। তিনি আবার বললেন: পড়! আমি বললাম: কি পড়ব? তিনি বললেন: ((اقْرَ‌أْ بِاسْمِ رَ‌بِّک الَّذِی خَلَقَ)) (পড়! তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’।[৩৭] প্রসিদ্ধ হল ৪০ বছর বয়সে তাঁর নবুয়্যতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করা হয়।[৩৮]

তাওহিদের প্রতি আমন্ত্রণকে মহানবি (সা.) সর্বপ্রথম নিজের পরিবার থেকেই শুরু করেন। নারীদের মধ্যে তাঁর প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন হযরত খাদিজা (সা. আ.) এবং পুরুষদের মধ্যে হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)।[৩৯] অবশ্য কিছু কিছু সূত্রে, প্রথম ঈমান আনয়নকারী হিসেবে আবু বকর বিন আবু কুহাফা ও যাইদ বিন হারেসা’র নাম উল্লিখিত হয়েছে।[৪০] প্রথমদিকে মহানবির (সা.) দাওয়াতের পরিধি সীমিত থাকলেও নব দীক্ষিত মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং কিছুদিনের মধ্যেই ঈমান আনয়নকারী মুসলমানরা মক্কার আশেপাশে যেয়ে মহানবির (সা.) সাথে নামাজ আদায় করা শুরু করল। [৪১]

প্রকাশ্যে দাওয়াত

নবুয়্যতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর তিনি ৩ বছর যাবত গোপনে মানুষকে দাওয়াত দিতে থাকেন। শুরুর দিনগুলোতে তিনি (সা.) জনগণকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আল্লাহর উপাসনার প্রতি আহবান জানাতেন। মুসলমানরা নামাজ ও ইবাদতের সময় জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে লোকালয় থেকে দূরের কোন স্থানে সমবেত হয় নামাজ আদায় করতেন।[৪২] প্রসিদ্ধি রয়েছে যে, বে’সাতের (আনুষ্ঠানিক নবুয়্যত ঘোষণা) ৩ বছর পর তিনি (সা.) প্রকাশ্যে দাওয়াতের জন্য নির্দেশিত হন। ইবনে ইসহাক লিখেছেন ‘ইনযারের আয়াত’ -((وَأَنذِرْ‌ عَشِیرَ‌تَک الْأَقْرَ‌بِینَ ..)) ‘তোমার নিকটত্মীয়দেরকে সতর্ক কর’[৪৩]- অবতীর্ণ হলে মহানবি (সা.) একটি ভোজের আয়োজন করলেন এবং ঐ ভোজে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানদের ৪০ জনকে আমন্ত্রণ জানালেন। আপ্যায়নের পর্ব শেষে মহানবি (সা.) কিছু বলতে চাইলেন কিন্তু আবু লাহাব তাঁকে (সা.) জাদুকর আখ্যায়িত করল এবং হট্টগোল করে সভা ভেঙ্গে দিল। মহানবি (সা.) আবারও তাদের জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন এবং তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিলেন।[৪৪]

তাবারীর বর্ণনার ভিত্তিতে, আল্লাহর রাসূল (সা.) আত্মীয়দের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দেবার পর বললেন: তোমাদের মধ্য থেকে কে আমাকে এ কাজে সাহায্য করবে যাতে তোমাদের মাঝে সে আমার ভাই, ওয়াছি (নির্বাহী), খলিফা ও স্থলাভিষিক্ত হতে পারে? সকলেই চুপ করে রইল, কিন্তু আলী (আ.) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমি (আপনাকে সহযোগিতা করব)। মহানবি (সা.) বললেন: এ হল তোমাদের মাঝে আমার ওয়াছি ও খলিফা। তার কথা শোন্ এবং তার আনুগত্য কর।[৪৫]

কুরআইশের শত্রুতা

গোত্রীয় চুক্তির কারণে কুরাইশ, মহানবির (সা.) কোন ক্ষতি বা তাকে হত্যা করার সাহস দেখাত না। কারণ তারা এ ধরনের কোন পদক্ষেপ নিলে তার অর্থ হতো বনি হাশিমের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া এবং অন্যান্য গোত্রও এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল, এ কারণে তাদের বিরোধিতা কটুবাক্য, অপবাদ ও ছোটখাটো ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে অসহায় নওমুসলিমদের উপর যেভাবে চাইত নির্যাতন করত এবং তাদেরকে শাস্তি দিত ও তাদের ক্ষতি করত।[৪৬]

দিনের পর দিন বাড়তে থাকা মুসলমানদের সংখ্যার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে কুরাইশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মহানবির (সা.) চাচা হযরত আবু তালিবের কাছে গেল এবং তিনি যেন নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রকে তাঁর দাওয়াত থেকে বিরত রাখে এ মর্মে আহবান জানাল। একদিন তারা বলল, যেন মুহাম্মাদকে (সা.) তাদের হাতে সোপর্দ করা হয় যাতে তাঁকে তারা হত্যা করতে পারে। বিনিময়ে তারা আমারাহ ইবনে ওয়ালিদকে -যে ছিল সুদর্শন যুবক এবং তাদের ভাষায় বুদ্ধিমান- দিতে চাইল। কিন্তু হযরত আবু তালিব তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।[৪৭] মক্কাবাসীগণ অত্যাচার নির্যাতনে কাজ হচ্ছে না দেখে প্রলোভনের কৌশল অবলম্বন করল। প্রথমে হযরত আবু তালিবকে দিয়ে তাঁকে বাধা প্রদানের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এবার তারা প্রস্তাব দিল যদি মুহাম্মাদ (সা.) নিজের দাওয়াত প্রদান থেকে বিরত থাকে তাকে তারা আরবের রাজা বানিয়ে দেবে। ধন-সম্পত্তি দিয়ে আরবের সেরা ধনী বানিয়ে দেবে। আর যদি মুহাম্মদ (স) চায় তা হলে সবচেয়ে সুন্দরী রমণীর সাথে তার বিয়ের ব্যবস্থা করবে। মোটকথা, দাওয়াত থেকে বিরত থাকলে তিনি যা চাইবেন, তাই-ই দেয়া হবে। মহানবি (সা.) উত্তরে বললেন: ‘আল্লাহর কসম, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদও দিয়ে দেয়, তবুও আমি আমার দাওয়াত থেকে পিছপা হব না। ততদিন পর্যন্ত যতদিন না মহান আল্লাহ্ আমাকে এ পথে বিজয়ী করবেন অথবা এ পথে আমি জীবন দিয়ে দেই।[৪৮]

আবিসিনিয়ায় প্রথম হিজরত

মহানবির (সা.) সাথে কুরাইশের শত্রুতা বৃদ্ধি এবং তাঁর অনুসারীদর উপর অমানবিক নির্যাতনের ফলে তিনি (সা.) মুসলমানদেরকে হাবাশাতে (আবিসিনিয়া) হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। কুরাইশ মুসলমানদের হাবাশাতে হিজরতের ঘটনা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর তাদেরকে ফেরত আনার জন্য আমর বিন আস ও আব্দুল্লাহ বিন আবি রাবিয়াকে হাবাশার বাদশা নাজ্জাশীর নিকট পাঠায়। কিন্তু নাজ্জাশী নও মুসলিমদেরকে কুরাইশ প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানান।[৪৯]

অবরুদ্ধ বনি হাশিম

মক্কায় ইসলামের প্রসার এবং নব দীক্ষিত মুসলিমদেরকে ফেরত পাঠাতে নাজ্জাশী অস্বীকৃতি জানানোর পর কুরাইশ মুহাম্মাদ (সা.) ও বনি হাশিমের উপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিল। তারা একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর পূর্বক এ মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ হল যে, মক্কার কোন ব্যক্তি বনি হাশেম ও বনি মুত্তালিব গোত্রের সাথে আত্মীয়তা করবে না। তাদের কাছে কিছু বিক্রি করবে না এবং তাদের থেকে কিছু ক্রয়ও করবে না। তারা এই চুক্তিনামা কা’বার দরজায় টাঙিয়ে দিল। ফলে হযরত আবু তালিব বাধ্য হয়ে বাড়ি ঘর ছেড়ে মহানবিসহ (সা.) বনি হাশিম ও বনি মুত্তালিব গোত্রের নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাধ্য হয়ে শি’বে আবি ইউসুফ উপত্যকায় পরবর্তীতে যা শিবে আবু তালিব নাম ধারণ করে আত্মনির্বাসিত হলেন।[৫০] বনি হাশিম ৩ বছরের জন্য অবরুদ্ধ এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা হল। চরম খাদ্য সংকটের মাঝে তাদের জীবন কাটছিল। এ সময় তাদের কয়েকজন আত্মীয় মাঝে মাঝে তাদের কাছে গম পৌঁছে দিত। একরাতে মহানবি (সা.) ও বনি হাশিমের ঘোরশত্রু আবু জাহল বিষয়টি সম্পর্কে জেনে যায় এবং হযরত খাদিজার নিকট গম পৌঁছে দিতে হাকিম বিন হিযামকে বাধা দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি দল অনুতপ্ত ও বনি হাশিমের সমর্থনে আওয়াজ তোলে। তারা বলল: কেন বনি মাখযুম আরাম-আয়েশের মধ্যে দিনাতিপাত করবে এবং বনি হাশিম ও বনি আব্দুল মুত্তালিব এত কষ্ট করবে! অবশেষে তারা ঐ চুক্তিপত্র বাতিলের দাবী তুলল। ঐ চুক্তিতে সাক্ষরকারীদের একটি দল সেটি ছিঁড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল। মহানবির (সা.) জীবনীর প্রথম লেখক ইবনে ইসহাকের (৮০-১৫১ হি.) বর্ণনার ভিত্তিতে, তারা সেই চুক্তিপত্র বের করে দেখল তা উঁইপোকায় খেয়ে ফেলেছে এবং শুধুমাত্র ((باسمک اللهم)) বাক্যটি অক্ষত রয়েছে।[৫১]

হিজরী ২য় শতাব্দির বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম (মৃত্যুকাল ২১২ বা ২১৮ হি.) লিখেছেন, আবুতালিব কুরাইশের সভায় উপস্থিত হয়ে বললেন: আমার ভ্রাতুষ্পুত্র বলছে, তোমরা যে চুক্তিপত্রতে স্বাক্ষর করেছিলে তা উঁইপোকা খেয়ে ফেলেছে এবং শুধু আল্লাহর নাম অক্ষত রয়েছে। তোমরা যেয়ে এর সত্যতা যাচাই কর, যদি তাঁর কথা সত্য হয় তবে তোমরা অবরোধ তুলে নেবে, আর যদি সে মিথ্যা বলে থাকে তাহলে আমি তাঁকে তোমাদের নিকট সোপর্দ করব। তারা দ্রুত ঐ চুক্তিপত্র যাচাই করল এবং দেখল যে আল্লাহর নাম ব্যতীত সবকিছুই উঁইপোকা খেয়ে ফেলেছে। আর এভাবেই বনি হাশিম বিরোধী অবরোধ ভেঙ্গে গেল।[৫২]

তায়েফ সফরে

শি’বে আবু তালিব থেকে বেরিয়ে আসার অল্পদিনের মধ্যে মহানবি (সা.) নিজের দুই প্রধান সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক হযরত আবুতালিব ও হযরত খাদিজাকে হারান। এ সময় তিনি তায়েফের জনগণকে ইসলামের প্রতি আহবান জানানোর জন্য তায়েফে যান। কিন্তু ওখানকার গোত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর (সা.) দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে গোত্রের মূর্খ ও দুষ্টু প্রকৃতির লোকদেরকে তাঁর (সা.) বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। তাদের আক্রমনে মহানবি (সা.) চরমভাবে আহত হয়ে কোনক্রমে মক্কায় ফিরে আসেন।[৫২]

মদিনায় হিজরত

হিজরতের ভূমিকা

আকাবার প্রথম শপথ

বে’সাতের ১১তম বছরে হজ্জের মৌসুমে খাযরাজ গোত্রের ৬জন ব্যক্তি মহানবির (সা.) সাথে সাক্ষাত করেন। এ সময় মহানবি (সা.) নিজের দাওয়াত তাদের সামনে উপস্থাপন করলে তারা তাঁর (সা.) ধর্মের বাণী নিজ গোত্রের লোকদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। পরবর্তী বছর হজ্জের মৌসুমে মদিনার ১২ জন লোক আকাবাহ নামক স্থানে মহানবির (সা.) সাথে বাইয়াত করেন। তাদের চুক্তির বিষয়বস্তু ছিল এমন যে, ‘আমরা আল্লাহর রাসূলের (সা.) সাথে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হলাম যে, ‘আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক ও অংশীদার করব না, চুরি ও ব্যভিচার থেকে বিরত থাকব, নিজ সন্তানাদিকে হত্যা করব না, একে অপরের ওপর অপবাদ আরোপ করব না, অশ্লীল ও মন্দ কাজ করব না এবং ভালো কাজের বিরোধিতা করব না।’ মহানবি (সা.) ইয়াসরিবের জনগণকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাতে ও তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতে মুসআব বিন উমাইরকে তাদের সাথে প্রেরণ করলেন। আর তাকে বললেন যেন শহরের অবস্থা এবং জনসাধারণের মাঝে ইসলামের প্রভাব সম্পর্কে তাঁকে অবগত করেন।[৫৩]

আকাবার দ্বিতীয় শপথ

নবুয়্যতের ১৩তম বছরে হজ্জের মৌসুমে খাযরাজ গোত্রের ৭৩ জন নারী ও পুরুষ হজ্জের কার্যক্রম শেষে আকাবায় সমবেত হলেন। মহানবি (সা.) স্বীয় চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। উল্লেখ আছে যে, তাদের মাঝে প্রথম কথা বলেছিলেন আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব। তিনি বলেন: হে খাযরাজ গোত্রীয়রা! মুহাম্মাদ আমাদের (সম্প্রদায়ের), আমাদের সাধ্যানুযায়ী আমরা তাঁকে জনগণের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেছি। এখন তিনি আপনাদের মাঝে অবস্থান করতে চান। তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করুন। তাঁকে শত্রুদের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ রাখতে আপনারা সক্ষম হন তাহলের তা কতই না ভাল, কিন্তু যদি আপনারা সক্ষমতা না থাকে তাহলে এখনই তাঁকে ছেড়ে দিন’। তারা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের উত্তরে বললেন: আপনার কথা শুনেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট এবং আপনার প্রভুর নিকট যা কিছু পছন্দনীয় তা বলুন!’ মহানবি (সা.) কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন অতঃপর বললেন: ‘তোমাদের সঙ্গে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছি যে, তোমরা তোমাদের পরিবার ও সন্তানদেরকে যেরূপ প্রতিরক্ষা কর আমাকেও সেরূপ প্রতিরক্ষা করবে।’

মদিনার প্রতিনিধিরা এ মর্মে তাঁর (সা.) সাথে বাইয়াত করলেন যে, তাঁর শত্রুদের সাথে শত্রুতা এবং তাঁর বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব পোষণ করবেন। আর যেই তাঁর সাথে যুদ্ধের ঘোষণা করবে তার সাথে যুদ্ধ করবেন, আর এ কারণে এ বাইয়াতকে ‘বাইয়াতুল হারব’ও বলা হয়। এই বাইয়াত অনুষ্ঠিত হওয়ার পর মহানবি (সা.) মুসলমানদেরকে ইয়াসরিবে হিজরতের অনুমতি দিলেন।[৫৪]

দারুন নাদভায় ষড়যন্ত্র

যখন মহানবির (সা.) সাথে ইয়াসরিবের জনগণের বাইয়াত এবং মহানবিকে (সা.) প্রতিরক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে তাদের অঙ্গীকারের কথা কুরাইশে কানে গেল তখন তারা গোত্রীয় চুক্তি লঙ্ঘন করে মহানবিকে (সা.) হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করল। তাদের এ কুউদ্দেশ্য বাস্তবায়নের উপযুক্ত উপায় বের করার লক্ষ্যে দারুন নাদভা’তে তারা সভায় বসল এবং অবশেষে এ ফলাফলে পৌঁছাল যে, সম্মিলিতভাবে মহানবিকে (সা.) হত্যা করা হবে। এ লক্ষ্যে প্রত্যেকটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেবে এবং সকলে মিলে তাঁকে হত্যা করবে। তাঁর হত্যাকারী বিভিন্ন গোত্র থেকে হওয়ায় বনি হাশিম তাঁর রক্তের বদলা নিতে পারবে না। কারণ সব গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তারা সক্ষম নয় এবং বাধ্য হয়ে তারা রক্তমূল্য নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের রাতে মহান আল্লাহর নির্দেশে মহানবি (সা.) মক্কা ত্যাগ করলেন এবং শত্রুরা যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে টের না পায় নিজের বিছানায় হযরত আলীকে (আ.) ঘুমানোর নির্দেশ দিলেন। আলীও (আ.) ৪০ তলোয়ারের আঘাত উপেক্ষা করে মহানবির (সা.) জীবন বাঁচাতে তাঁর বিছানায় নির্বিঘ্নে শুয়ে পড়লেন (লাইলাতুল মাবিত)। মহানবি (সা.) আবু বকর বিন আবু কুহাফার সাথে ইয়াসরিবের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন, এ সময় তারা সাওর পাহাড়ের গুহাতে ৩ দিনের জন্য আত্মগোপন করেছিলেন, যাতে তাঁর সন্ধানে বের হওয়া লোকেরা নিরাশ হয়ে ফিরে যায়। এরপর মহানবি (সা.) অপরিচিত পথ ধরে ইয়াসরিব পৌঁছান।[৫৫]

হিজরতের সূচনা

মহানবি (সা.) কবে মক্কা থেকে বের হয়েছিলেন এবং মদিনায় পৌঁছেছিলেন এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তাঁর সিরাহ (জীবনী) লেখক ইবনে হিশাম লিখেছেন, তিনি ১২ রবিউল আওয়াল সোমবার দ্বিপ্রহরে কোবা পল্লীতে পৌঁছান। ইবনে কালবি বলেন, তিনি (সা.) সোমবার ১লা রবিউল আওয়াল মক্কা ত্যাগ করেন এবং ১২ রবিউল আওয়াল শুক্রবার কোবায় পৌঁছান। আবার কেউ কেউ লিখেছেন, তিনি ৮ রবিউল আওয়াল কোবায় পৌঁছান। সাম্প্রতিককালের মুসলিম ও ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মতে মহানবি (সা.) তাঁর ৯ দিনের সফর শেষ করে নবুয়্যতের ১৪তম বছরের ১২ রবিউল আওয়াল মোতাবেক ২৪ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রি. মদিনার নিকটবর্তী কোবা পল্লীতে পৌঁছান। মহানবির (সা.) হিজরতের মধ্য দিয়ে ইসলামি ক্যালেন্ডারে বর্ষপঞ্জী’র (হিজরী) সূচনা হয়। আল্লাহর রাসূল (সা.) কোবায় অবস্থানকালীন সময়ে ঐ গ্রামে একটি মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন ‘কোবা মসজিদ’ নামে যা বিখ্যাত।[৫৬] মহানবির (সা.) মক্কা থেকে হিজরতের ৩ দিন পর হযরত আলী (আ.) তাঁর (সা.) নিকট গচ্ছিত মক্কার লোকদের আমানত সেগুলোর মালিকদের কাছে হস্তান্তরের পর বনি হাশিমের নারীদের সাথে -যাদের মাঝে হযরত ফাতেমাও (সা. আ.) ছিলেন- মদিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং কোবা পল্লীতে কুলসুম বিন হাদমের গৃহে এসে মহানবির (সা.) সাথে যুক্ত হন।[৫৭]

শুক্রবার ১২ রবিউল আওয়াল মহানবি (সা.) বনি নাজ্জার গোত্রের একদল লোককে সঙ্গে নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং প্রথম জুমআর নামাজ বনি সালেম বিন আওফ গোত্রে আদায় করেন। তিনি শহরে প্রবেশ করলে প্রত্যেক গোত্রের প্রধান এবং পরিবারের কর্তারা তাঁকে নিজ বাড়ি নিতে চাইলেন। মহানবি (সা.) বললেন: আমার উট যেখানে বসবে সেখানেই আমার আবাসস্থল হবে। তিনি (সা.) আমন্ত্রণকারীদের উদ্দেশ্যে বললেন: উটের জন্য রাস্তা উন্মুক্ত কর সে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং জানে যে তাকে কোথায় যেতে হবে। উট বনি মালিক ও বনি নাজ্জার গোত্রের মাঝামাঝি সাহল ও সুহাইল নামক দুই এতিম সহোদরের অধিকৃত স্থানে বসে পড়ল। মহানবি (সা.) ঐ জমির দুই মালিকের তত্ত্বাবধায়ক মুয়াজ বিন আফরার কাছ থেকে জমিটি কিনে নিলেন এবং সেখানে মসজিদ নির্মাণ করলেন, যা ছিল মসজিদে নববির ভিত্তি। স্থানটি খেজুর ও অন্যান্য ফসল শুকানোর জন্য ব্যবহৃত হত। হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর গৃহ এর সন্নিকটেই ছিল। তাঁর মাতা গোপনে রাসূলের (সা.) আসবাবপত্র নিজ গৃহে উঠালেন। এদিকে সকলে নবীকে (সা.) নিজ গৃহে নেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। মহানবী তাদের থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: ‘(আমার) আসবাবপত্র কোথায়?’ সকলে বলল, ‘আবু আইয়ুবের মা তা নিয়ে গেছেন।’ মহানবী বললেন, ‘লোকেরা সেখানেই ওঠে যেখানে তার আসবাবপত্র থাকে।’ অতঃপর আসআদ ইবনে জুরারাহ্ উটের রশি ধরে নবীকে (সা.) সেখানে পৌঁছে দেন। মহানবির (সা.) হুজরা (কামরা) তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তিনি আবু আইয়ুব আনসারির বাড়িতে অবস্থান করেন এবং মসজিদ নির্মাণে মুসলমানদের সাহায্য করতে থাকেন।[৫৮] মক্কা থেকে আগত মুসলমানরা মদিনায় মুহাজির নাম পেল এবং ইয়াসরিবের বাসিন্দা আনসাররা তাদেরকে নিজেদের বাড়ীতে স্থান দিতে লাগল। মহানবি (সা.) আনসার ও মুহাজিরদেরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করলেন এবং নিজে আলী ইবনে আবি তালিবের (আ.) সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।[৫৯]

মদিনায় প্রবেশের কিছুদিনের মধ্যে মহানবি (সা.) ইহুদিরাসহ শহরের অন্যান্য বাসিন্দাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেন, যাতে সবাই পরস্পরের সামাজিক অধিকার রক্ষা করে চলে।[৬০]

মদিনায় মুনাফিক ও ইহুদীদের বাধা

ইয়াসরিবের অধিকাংশ জনগণ মুসলমানদেরকে সমর্থন করলেও আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মতো লোকেরা নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দিয়ে গোপনে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত।[৬১] এই দলটিকে মুনাফিক (কপট) বলা হত। এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা মুশরিক ও ইহুদীদের চেয়েও কষ্টকর ছিল; কারণ মনে মনে ইসলামের বিরোধিতা করলেও বাহ্যিকভাবে নিজেদেরকে মুসলমান বলে পরিচয় দেওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও দুস্কর ছিল।[৬২] ৯ হিজরীতে মৃত্যু পর্যন্ত আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইসলাম ও মহানবির (সা.) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে।

মদিনায়কৃত চুক্তির ভিত্তিতে ইহুদিরা কিছু অধিকার প্রাপ্ত হয়, এমনকি যুদ্ধেলব্ধ গনিমতেও তারা অংশীদ্বার ছিল। কিন্তু তারা শুরুতে মুসলমানদের পক্ষে থাকার আচরণ করে এবং তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ইসলাম গ্রহণ করলেও অবশেষে ইসলামের প্রতি অসন্তুষ্ট দেখাতে থাকে। এই অসন্তোষের কারণ হল, মদিনার অর্থনীতির উপর তাদের আধিপত্ব ছিল, পাশাপাশি বেদুঈন আরব এবং মক্কার মুশরিকদের সাথেও তারা লেনদেন করত, তাদের আশা ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নেতৃত্বে মদিনার অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব বাড়বে। কিন্তু মহানবি (সা.) শহরে প্রবেশ এবং ইসলাম ধর্মের প্রসার তাদের এ পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর উর্ধ্বে ইহুদি বংশোদ্ভূত নয় এমন কেউ নবুয়্যত লাভ করুক ইহুদিদের জন্য এটা মেনে নেয়া কষ্টকর ছিল। আর এ কারণে তারা কিছুদিনের মধ্যেই মহানবির (সা.) বিরোধিতা প্রকাশ করল এবং এ কাজে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তাদেরকে উস্কে দিল। তারা বলল: আমরা যে নবীর অপেক্ষায় ছিলাম সে মুহাম্মাদ নয় এবং কুরআনের আয়াতের বিপরীতে তাওরাত ও ইঞ্জিলকে মুসলমানদের সামনে দাঁড় করাল। তারা বলল: যা কিছু কুরআন বলে এবং যা কিছু আমাদের গ্রন্থে রয়েছে তা এক নয়। পবিত্র কুরআনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আয়াত এ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। ঐ সকল আয়াতে যা কিছু উল্লিখিত হয়েছে তার ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে তাওরাত ও ইঞ্জিলে বিচ্যুতি ঘটানো হয়েছে এবং ইহুদি ধর্মযাজক ও পণ্ডিতরা নিজেদের অবস্থান ও আধিপত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সেগুলোতে পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

অবশেষে ইসলাম এবং ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা এল। আর আরবরা যাতে বুঝতে পারে যে, মুসলমানরা ইহুদিদের বিপরীতে আলাদা একটি জাতি এ জন্য বলল: আরবগণ হযরত ইব্রাহিমের জাতির অন্তর্ভুক্ত এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.) হলেন ইসরাইলের পিতামহ।

يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَآجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنزِلَتِ التَّورَاةُ وَالإنجِيلُ إِلاَّ مِن بَعْدِهِ أَفَلاَ تَعْقِلُونَ﴿۶۵﴾ هَاأَنتُمْ هَؤُلاء حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُم بِهِ عِلمٌ فَلِمَ تُحَآجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُم بِهِ عِلْمٌ وَاللّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لاَ تَعْلَمُونَ﴿۶۶﴾مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلاَ نَصْرَانِيًّا وَلَكِن كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

হে আহলে কিতাব! তোমরা কেন ইবরাহীম সম্পর্কে তর্ক করছ? তাওরাত এবং ইঞ্জিল তো তারপরেই অবতীর্ণ হয়েছে, তোমরা কি তাও বুঝ না? বস্তুতঃ তোমরাই এমন লোক যে, যে সম্পর্কে তোমাদের কিছু জ্ঞান আছে, সে বিষয়ে তো বিতর্ক করেছ, তোমরা এমন বিষয়ে কেন বিতর্ক করছ যে বিষয়ে তোমাদের কোনই জ্ঞান নেই? বস্তুতঃ আল্লাহ্ই জ্ঞাত আছেন, তোমরা জ্ঞাত নও। ইবরাহীম না ছিল ইহুদী, না নাসারা বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী, আর তিনি মুশরিক দলের অন্তর্ভুক্তও ছিল না।[৬৩]

কিবলা পরিবর্তন

আল্লামা তাবাতাবায়ী বলেছেন, বেশীর ভাগ সূত্রের বর্ণনার ভিত্তিতে কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা ২য় হিজরীর রজব মাসে (মহানবির (সা.) মদিনায় প্রবেশের ১৭ মাস পর) ঘটেছিল।[[৬৪]] ইমাম সাদিক (আ.) থেকে বর্ণিত এক রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে কিবলা পরিবর্তনের আগ পর্যন্ত মুসলমানরা মসজিদুল আকসার দিকে ফিরে নামাজ আদায় করত। এ কারণে ইহুদীরা মহানবিকে (সা.) তিরস্কার করে বলত: তুমি আমাদের অনুসারী এবং আমাদের কিবলামুখী হয়ে নামাজ পড়। এই তিরস্কার আল্লাহর রাসুল (সা.) অসন্তুষ্ট ছিলেন। একদিন বানি সালামা মসজিদে যোহরের নামাজ আদায়ের সময় হযরত জীবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হলেন এবং নামাজরত অবস্থায় তাঁকে কা’বার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন এবং কিবলা সংশ্লিষ্ট আয়াত (বাকারাহ : ১৪৪) অবতীর্ণ হল। অতএব, মহানবি (সা.) যোহরের নামাযের ২ রাকাত বাইতুল মোকাদ্দাসের দিকে ফিরে এবং ২ রাকাত নামাজ কা’বার দিকে ফিরে আদায় করলেন। এ ঘটনায় ইহুদীরা প্রতিবাদ ও শোরগোল করল।[৬৫]

سَيَقُولُ السُّفَهَاء مِنَ النَّاسِ مَا وَلاَّهُمْ عَن قِبْلَتِهِمُ الَّتِي كَانُواْ عَلَيْهَا قُل لِّلّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ يَهْدِي مَن يَشَاء إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ؛ ‘শীঘ্রই এ নির্বোধেরা বলবে, কিসে তাদেরকে ফিরিয়ে দিল তাদের সেই ক্বিবলা হতে যা তারা অনুসরণ করে আসছিল। বল, পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহরই, তিনি যাকে ইচ্ছে সরল পথ প্রদর্শন করেন।’[৬৬]

قال رسول الله(ص): لَا فَقْرَ أَشَدُّ مِنَ الْجَهْلِ وَ لَا مَالَ أَعْوَدُ مِنَ الْعَقْل‏ আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘মূর্খতার চেয়ে বড় দারিদ্রতা আর নেই এবং জ্ঞানের চেয়ে বড় কোন সম্পদ নেই।[৬৭]

যুদ্ধ ও সংঘাত

বদরের যুদ্ধ

মহানবির (সা.) সাথে মদিনার জনগণের আকাবায় দ্বিতীয় শপথের পর কুরাইশের সাথে মুসলমানদের সংঘাতের বিষয়টি অনুমেয় ছিল।[৬৮] ২য় হিজরীর সফর মাসে প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয় যা আবওয়া বা ওয়াদ্দানের যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।[৬৯] এ ঘটনায় সেনা মোতায়েন হলেও কোন সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। এরপরের যুদ্ধ ছিল রবিউল আওয়াল মাসে, যা বুওয়াত নামে পরিচিত তবে এতেও কোন সংঘাত হয়নি।

জমাদিউল আওয়াল মাসে সংবাদ এল, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশের কাফেলা মক্কা থেকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। মহানবি (সা.) তাদেরকে ধাওয়া করতে ‘যাতুল আশিরাহ’য় পৌঁছান কিন্তু কুরাইশের কাফেলা তার আগেই ঐ স্থান অতিক্রম করে চলে যায়। সৈন্য মোতায়েন করেও কোন ফল না পাওয়ার নেপথ্য কারণ ছিল, মদিনার অভ্যন্তরে থাকা গোয়েন্দারা। তারা মহানবির (সা.) সিদ্ধান্ত জেনে মুসলিম বাহিনী রওনা হওয়ার আগেই প্রতিপক্ষের নিকট সংবাদ পৌঁছে তাদেরকে সতর্ক করে দিত।[৭০]

দ্বিতীয় হিজরীতে মুসলিম ও মুশরিক বাহিনীর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সংঘাতের ঘটনা ঘটে যা ‘বদরের যুদ্ধ’ নামে প্রসিদ্ধ। মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা মুশরিকদের সৈন্যদের তুলনায় কম হলেও মুসলমানরা এ যুদ্ধে বিজয়ী হয় এবং এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুশরিক সৈন্য নিহত ও বন্দী হয়।[৭২. ওয়াকেদি, আল-মাগ্বাযি, ১৪০৫ হি., খণ্ড ১, পৃ. ১৯ এর পর থেকে।] এ যুদ্ধে আবু জাহলসহ কুরাইশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি নিহত অথবা বন্দী হয়। এছাড়া ১৪ জন মুসলিম সৈন্যও বদরের যুদ্ধে শহীদ হন। এতে হযরত আলীর (আ.) হাতে মক্কার বেশ কয়েকজন বীর নিহত হয়।[৭১]

ইহুদিদের সাথে সংঘাত

বদরের যুদ্ধের কয়েক সপ্তাহ পর ইহুদিদের সাথে মুসলমানদের প্রথম সংঘাতের ঘটনা ঘটে। বনি কাইনুকার ইহুদিদের মদিনার বাইরে স্বর্ণালংকর ও লোহার জিনিসপত্র তৈরীর কারখানা ছিল। বর্ণিত আছে একদা এক আরব মহিলা বনি কাইনুকার বাজারে গিয়ে পন্য বিক্রির পর একটি স্বর্ণকারের দোকানে বসে পড়ে। এ সময় এক ইহুদি তার কাপড়ের এক মাথা তার পেছন দিকে গিঁট দিয়ে দেয়। ঐ মহিল যখন উঠে দাঁড়ায় তখন তার পোশাক শরীরের একদিকে চলে যায়, এ সময় উপস্থিত ইহুদিরা হেসে ওঠে। ঐ মহিলা মুসলমানদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকলে এক মুসলমান ঐ নারীর সাহায্য এগিয়ে আসে এতে এক ইহুদি নিহত হয়। ইহুদিরাও ঐ মুসলমানকে হত্যা করে। এ ঘটনার পর মহানবি (সা.) ইহুদিদের উদ্দেশ্যে বললেন: এখানে থাকতে হলে আত্মসমার্পন করতে হবে। বনি কাইনুকার লোকেরা উত্তরে বলল: মক্কার বাহিনীর পরাজয় যেন তোমাকে প্রতারিত না করে। তারা তো যোদ্ধা নয়। আমরা যদি তোমার সাথে যুদ্ধ করি তাহলে তোমাকে দেখাব আমরা কি করতে পারি। মহানবি (সা.) তাদেরকে অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন এবং এ অবরোধ ১৫ দিন অব্যাহত ছিল। এরপর তারা আত্মসমার্পন করলে মহানবি (সা.) যেন তাদেরকে হত্যা না করে ক্ষমা করে দেন এবং তাদেরকে সিরিয়ায় নির্বাসনে দেন এ লক্ষ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই পীড়াপীড়ি করতে লাগল। ইহুদিদের এ দলটির অবরোধের ঘটনা হিজরী সনের দ্বিতীয় বছরে ঘটেছিল।[৭২]

ওহুদের যুদ্ধ

তৃতীয় হিজরীতে কুরাইশ তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ গোত্রগুলোর কাছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাহায্য চাইল। এরপর তারা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সুসজ্জিত এক বাহিনী নিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হল। প্রথমে মহানবি (সা.) মদিনায় থেকে তাদের মোকাবিলা করতে চাইলেও পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিলেন মদিনার বাইরে তাদের মোকাবিলা করবেন। ওহুদ পাহাড়ের কাছাকাছি একটি স্থানে দুই বাহিনী পরস্পরে মুখোমুখি হল। সংঘর্ষের শুরুতে মুসলমানরা বিজয়ী হলেও খালেদ বিন ওয়ালিদ মুসলিম বাহিনীর একটি দলের গাফিলতির সুযোগ নিয়ে মুসলিম বাহিনীর পেছনে পৌঁছে যায় এবং পেছন থেকে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমন করে বসে। ফলে মুসলমানদের বিজয় পরাজয়ে রূপান্তরীত হয়। এ যুদ্ধে আল্লাহর রাসূলের (সা.) চাচা হযরত হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব শহীদ হন। মহানবিও (সা.) গুরুতর আহত হন। তাঁর (সা.) শাহাদাতের গুজব ছড়িয়ে পড়লে মুসলিম বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যায়।[৭৩] ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন: ওহুদের যুদ্ধ ১৫ই শাওয়াল ঘটেছিল।[৭৪] মুসলিম সৈন্যদের পলায়নে মহানবির (সা.) জীবন হুমকির মুখে পড়ে এ সময় যে বীরত্ব হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) দেখিয়েছিলেন সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মতৈক্য রয়েছে।


বনি নাযির ও দুমাতুল জান্দালের অভিযান

৪র্থ হিজরীতে ইসলাম ধর্মকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে মদিনার আশেপাশের কয়েকটি গোত্রের সাথে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, সংঘবদ্ধ হয়ে যাদের পক্ষ থেকে মদিনা আক্রমনের হুমকিও ছিল। রাজী’ ও বি’রে মাউনা’র ঘটনা তারই প্রমাণ; যাতে ইসলাম বিরোধী জোট বাহিনী প্রতারণা করে মুসলিম ধর্মপ্রচারকদেরকে হত্যা করেছিল। একইভাবে মদিনায় ইসলাম প্রচারে মহানবির (সা.) প্রচেষ্টার ফলপ্রসু হওয়াটাও এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়।[৭৫] এ বছর মহানবি (সা.) বনি নাযিরের (মদিনার ইহুদিদের একটি গোত্র) সাথে আলোচনায় বসেন, কিন্তু ইহুদিরা তাকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। ফলে পরিশেষে তারা ঐ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়।[৭৬]

৫ম হিজরীতে মহানবি (সা.) ও মুসলমানরা সিরিয়ার সীমান্তবর্তী দুমাতুল জান্দাল এলাকা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে। মুসলিম বাহিনী পৌঁছানোর আগেই শত্রু বাহিনী ঐ এলাকা ছেড়ে চলে যায় এবং মুসলমানরা মদিনায় ফিরে আসে।[৭৭]

আহযাব, বনি কুরাইযা ও বনি মুস্তালিকের যুদ্ধ

৫ম হিজরীতে আবু সুফিয়ান ৭০০০ মতান্তরে ১২০০০ সৈন্যের এক বাহিনী গঠন করে, এতে ছিল ৬০০ অশ্বারোহী। বিভিন্ন গোত্রের সৈন্য নিয়ে গঠিত হওয়ায় এ যুদ্ধকে আহযাবের (দলসমূহ) যুদ্ধ বলা হয়। খায়বারে বসবাসকারী ইহুদি গোত্র বনি নাযিরের একটি দল এ যুদ্ধে কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের সাথে মহানবির (সা.) বিরুদ্ধে হাত মেলায়। মদিনার আশেপাশে বসবাসরত বনি কুরাইজার ইহুদীরা -যারা কুরাইশদেরকে সাহায্য না করার বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ ছিল- চুক্তি ভঙ্গ করে মক্কার সাথে হাত মেলায়।

এর বিপরীতে মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০০; এর মাঝে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বাকিরা সবাই ছিল পদাতিক।

ওহুদের যুদ্ধের বিপরীতে এ যুদ্ধে শহরের মধ্যে থেকেই আত্মরক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং হযরত সালমান ফারসীর পরামর্শে শহর রক্ষার্থে পরিখা (খন্দক) খনন করা হয়, এ কারণে খন্দকের যুদ্ধ নামেও এ যুদ্ধের প্রসিদ্ধি রয়েছে। মদিনার ৩ দিক খেজুর বাগান এবং ভবন দ্বারা সুরক্ষিত ছিল এবং পরিক্ষা খননের মাধ্যমে উত্তর দিকের নিরাপত্তাটাও নিশ্চিত করা হল। মক্কার বাহিনী মদিনায় পৌঁছানোর আগেই পরিখা খননের কাজ শেষ হয়ে যায়। শত্রু বাহিনী পরিখার মুখোমুখি হয়ে অবাক হয়। কারণ এর আগে তারা সৈন্যদের অগ্রসর রুখতে এ ধরনের পরিকল্পনা কখনই দেখেনি। শত চেষ্টা করেও অশ্বারোহী বাহিনী পরীখা অতিক্রম করতে পারল না। কারণ তারা পরিখার কাছাকাছি আসতেই মুসলিম বাহিনীর তিরান্দাজ ইউনিট তাদেরকে রুখে দিল। তৎকালীন যুগের আরবের নামী বীর আমর বিন আব্দে উদ পরিখা পার হয়ে গেলেও হযরত আলীর (আ.) বীরত্বের সামনে সে টিকতে পারে নি এবং তাঁর (আ.) হাতে সে নিহত হয়।

কয়েকজন মুসলমান বনি কুরাইযা এবং গাতফান গোত্রের সাথে যোগাযোগ করে তাদের মনে পরস্পরের বিরুদ্ধে সন্দেহের সৃষ্টি করল। এদিকে শৈত্যপ্রবাহ মক্কার বাহিনীর জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলল। এ কারণে আবু সুফিয়ান প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দিল এবং এর মাধ্যমে ১৫ দিনের মাথায় মদিনা অবরোধের সমাপ্তি ঘটল। যুদ্ধের ফল মুসলমানদের পক্ষেই গেল। বেদুঈন আরবদের অনেকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হল এবং আবু সুফিয়ান ও কুরাইশের অবস্থান আরও নড়বড়ে হয়ে গেল। [৭৮]

আহযাবের যুদ্ধ শেষে মহানবি (সা.) বনি কুরাইযার ইহুদিদের বিষয়ে মনোনিবেশ করলেন। তারা মদিনা চুক্তির ভিত্তিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত সুরক্ষিত ও নিরাপদ ছিল। কিন্তু তারা আহযাবের যুদ্ধে ইসলামের শত্রুদের সাথে যোগ দিলে মহানবি (সা.) তাদেরকে ঘেরাও করলেন এবং তারা ২৫ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর আত্মসমার্পন করল। বনি কুরাইযার সাথে চুক্তিবদ্ধ অওস গোত্রের লোকেরা মহানবিকে (সা.) বলল: বনি কুরাইযার সাথে আমাদের চুক্তি রয়েছে, তারা তাদের কৃতকর্মের কারণে অনুতপ্ত। তাদের সাথে খাযরাজের সাথে চুক্তিবদ্ধদের (বনি কাইনুকা) মতো আচরণ করুন। বনি কাইনুকা’র বন্দীদের বিচারের দায়িত্ব অওস গোত্রের প্রধান সায়াদ বিন মুয়াজকে দিলেন। বনি কুরাইযাও এ সিদ্ধান্ত মেনে নিল। সায়াদ বললেন: আমার সিদ্ধান্ত হল তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করা হবে এবং নারী ও শিশুদেরকে বন্দী করা হবে। সায়াদের বিচার অনুযায়ী বড় গর্ত খনন করা হল এবং বনি কুরাইযার পুরুষদেরকে ঐ গর্তের পাশে শিরোশ্ছেদ করা হল।[৭৯] এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ রয়েছে।[৮০]

৬ষ্ঠ হিজরীতে মহানবির (সা.) বিরুদ্ধে সৈন্য সমাবেশের পায়াতারায় লিপ্ত বনি মুস্তালিক গোত্রকে মুসলমানরা পরাজিত করে।[৮১]

খায়বারের যুদ্ধ

৭ম হিজরীতে মহানবি (সা.) খায়বারের ইহুদিদেরকে পরাজিত করেন; ইতিপূর্বে তারা কয়েকবার মহানবির (সা.) শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। এ যুদ্ধে মদিনার অদূরে অবস্থিত দূর্ভেদ্য খায়বার দূর্গ মুসলমানদের কব্জায় আসে। মহানবি (সা.) ইহুদিদেরকে ঐ এলাকায় তাদের কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন এ শর্তে যে তাদের ফসলের কিছু অংশ তারা মুসলমানদেরকে প্রদান করবে।[৮২] খায়বারের যুদ্ধে একটি দূর্গ বিজয় করা কঠিন হয়ে গেল। আল্লাহর রাসূল (সা.) যথাক্রমে আবু বকর ইবনে আবি কুহাফা ও উমার ইবনে খাত্তাবকে ঐ দূর্গ বিজয়ের জন্য পাঠালেন কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। অবশেষে আলীর (আ.) হাতে পতাকা তুলে দিলেন। হযরত আলী (আ.) নজীরবিহীন লড়াই এবং অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করে ঐ দূর্গ জয় করেন।[৮৩]

হুদায়বিয়ার সন্ধি

খন্দকের যুদ্ধ, বনি কুরাইযার ইহুদিদের আত্মসমার্পন এবং ৬ষ্ঠ হিজরীর সব কয়টি যুদ্ধের ফল মুসলমানদের পক্ষে যায় পাশাপাশি যুদ্ধগুলো থেকে লব্ধ গনিমত ইসলামের শক্তিকে আরব উপদ্বীপের মানুষের চোখে বহুগুণে বাড়িয়ে দিল। এর ধারাবাহিকতায় বহু গোত্র ইসলামে দীক্ষিত হয় আবার কোন কোন গোত্র মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়।[৮২] ৬ষ্ঠ হিজরীর যিলক্বদ মাসে মহানবি (সা.) ১৫০০ মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে উমরাহ পালনের লক্ষ্যে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তাঁর (সা.) উদ্দেশ্যে সম্পর্কে অবগত হয়ে কুরাইশ তাঁকে (সা.) বাধা দিতে প্রস্তুতি নেয়। মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ রুখতে প্রথমে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আকরামাহ বিন আবু জাহলকে প্রেরণ করে। হুদায়বিয়া নামক স্থানে -যেখান থেকে হারাম এলাকা শুরু হয়- মহানবি (সা.) অবতরণ করলেন। তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে বার্তা পাঠালেন; আমরা যুদ্ধের জন্য নয়, যিয়ারত করতে এসেছি। কিন্তু কুরাইশ মহানবির (সা.) উমরাহ পালনে বাধা দিল এবং অবশেষে তাঁর ও মক্কার প্রতিনিধিদের মাঝে এ মর্মে চুক্তি স্বাক্ষরিত হল যে, আগামী ১০ বছর পর্যন্ত ২ পক্ষের মাঝে কোন যুদ্ধ হবে না এবং এ সময়ে মুসলমানরা মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু আগামী বছর এ সময় মক্কার জনগণ ৩ দিনের জন্য শহরের বাইরে চলে যাবে এবং শহরকে মুসলমানদের যিয়ারতের জন্য খালি করে দেবে। ঐ চুক্তির অপর শর্ত ছিল, যদি মক্কার কোন লোক মহানবির (সা.) কাছে যায় তবে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে, পক্ষান্তরে যদি কেউ মদিনা থেকে মক্কায় যায় কুরাইশ তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়। প্রত্যেকটি গোত্র মুসলমান বা কুরাইশের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে।[৮৪] পরবর্তীতে কুরাইশ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে মক্কা বিজয়ের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।[৮৫]

আল্লাহর গৃহের যেয়ারত

৭ম হিজরীর যিলক্বদ মাসে হুদায়বিয়ার চুক্তি অনুসারে মহানবি (সা.) উমরাহ পালনের লক্ষ্যে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। মহানবি (সা.) ও মুসলমানদের মসজিদুল হারামে প্রবেশ, বিশেষ ভাব গাম্ভির্যের সাথে তাঁদের উমরাহ পালন এবং মহানবিকে (সা.) যে সম্মান মুসলমান প্রদর্শন করছিল তা দেখে কুরাইশ নিশ্চিত হল মুহাম্মাদের (সা.) বিরোধিতার শক্তি আর তাদের নেই। এ কারণে মুশরিক কুরাইশের ২ বিশিষ্ট ব্যক্তি খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আমর বিন আস মদিনায় যায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে।[৮৬]

বিভিন্ন অঞ্চলের শাসকদের উদ্দেশ্যে পত্র প্রেরণ

হুদায়বিয়ার সন্ধির ঘটনার পর কুরআইশের আক্রমন থেকে মহানবি (সা.) কিছুটা নিশ্চিন্তে ছিলেন। ৭ম হিজরীতে মহানবি (সা.) পার্শ্ববর্তী রাজত্বগুলোর শাসক ও রাজাদেরকে দাওয়াত প্রদানের মনস্থ করলেন। এরপর তিনি পূর্ব রোমের সম্রাট, ইরান শাহানশাহ খসরু পারভেজ, আবিসিনিয়ার বাদশা নাজ্জাশি, ইয়ামামার গভর্নর এবং দামেস্কের গভর্নরসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় চিঠি পাঠিয়ে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন।[৮৭]

মক্কা বিজয়

হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির একটি ধারা ছিল যে কোন গোত্র মুসলমান বা কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে। খাযাআহ গোত্র মহানবির (সা.) সাথে এবং বনু বাকর কুরআইশের সাথে চুক্তি করে। ৮ম হিজরীতে বনু বাকর এবং খাযাআহ গোত্রের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে বনু বাকরের পক্ষ নিয়ে কুরাইশ তাদেরকে সহযোগিতা করে। কুরাইশ মহানবির (সা.) সাথে চুক্তিবদ্ধ গোত্রের সাথে সংঘাতে জড়ানোর কারণে হুদায়বিয়ার চুক্তি ভেঙ্গে যায়। এই ধৃষ্টতা জবাবহীন থাকবে না বিষয়টি বুঝতে পেরে আবু সুফিয়ান নতুন করে চুক্তি করার লক্ষ্যে মদিনায় যায়, কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি। মহানবি (সা.) ৮ম হিজরীতে ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলেন। মুসলিম বাহিনীর মক্কা অভিমুখে রওনা হওয়ার তথ্য যেন মদিনার বাইরে না ছড়ায় এ জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করলেন। মুসলিম বাহিনী ‘মুর আয-যুহরান’ নামক স্থানে পৌঁছালে রাসূলের (সা.) চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাতের আঁধারে তাবু থেকে বের হয়ে মক্কার কোন লোকের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলেন, উদ্দেশ্য মক্কায় এ বার্তা পৌঁছানো যে, ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে যেন কুরাইশ মহানবির (সা.) কাছে পৌঁছায়। ঐ রাতে তার আবু সুফিয়ানের সাথে দেখা হল এবং তিনি তাকে আশ্রয় দিয়ে মহানবির (সা.) কাছে নিয়ে এলেন। আবু সুফিয়ান মুসলমান হল। পরবর্তী দিন মহানবি (সা.) নির্দেশ দিলেন আবু সুফিয়ানকে এমন স্থানে রাখতে যেখান থেকে সে মুসলিম বাহিনীর প্রস্থান প্রত্যক্ষ করতে পারে। মুসলিম বাহিনীর বিশালতা ও ক্ষমতা দেখে হতবিহ্বল আবু সুফিয়ান আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে বলল: তোমার ভ্রাতুষ্পুত্রের রাজত্ব তো আরও বড় হয়েছে! আব্বাস বললেন: আক্ষেপ তোমার উপর! এটা রাজত্ব নয়, নবুয়্যতের প্রভাব। সে বলল: হ্যাঁ ঠিক তাই! আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব মহানবিকে (সা.) বললেন: আবু সুফিয়ান পছন্দ করে তাকে কোন বিষয়ে (মক্কার জনগনের তুলনায়) প্রাধান্য দেওয়া হোক। মহানবি (সা.) বললেন: (মুসলিম বাহিনীর মক্কায় উপস্থিতির সময়) যে নিজ গৃহে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ থাকবে। একইভাবে যে আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে সেও নিরাপদ থাকবে। যে মসজিদুল হারামে আশ্রয় নেবে সেও নিরাপত্তা পাবে। বিশাল মুসলিম বাহিনী ধীরে ধীরে মক্কায় প্রবেশ করল।

ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃতিতে ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন: খাযরাজ গোত্র প্রধান সায়াদ বিন উবাদাহ মক্কায় পৌঁছে বলল: আজ হত্যাযজ্ঞের দিন! আজ সম্মান নষ্ট হওয়ার দিন। সায়াদ তার ধারণায় কুরাইশ বা আদনানি গোত্র থেকে প্রতিশোধ নিতে এবং এর মাধ্যমে কুরাইশ ও মক্কার জনগণ থেকে ইয়াসরিব ও মদিনার লোকদের অধিকারও আদায় করতে চেয়েছিলেন। এই ধরনের চিন্তা যেন মুসলমানদের মনে না আসে এবং ইসলামি বিজয় গোত্রীয় বিদ্বেষ হিসেবে সাব্যস্ত না হয়, এ কারণে মহানবি (সা.) হযরত আলীকে (আ.) পাঠলেন সায়াদের কাছ থেকে পতাকা নিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়ে, তিনি বললেন: আজ রহমতের দিন।

মুসলমান এবং মক্কার জনগণের মাঝে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ছাড়া বড় কোন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। মহানবি (সা.) মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন এবং আরোহনরত অবস্থায় ৭ বার কা’বাগৃহ তাওয়াফ করলেন। অতঃপর কা’বার দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন:

«لا اله الا الله وحده لا شریک له صدق وعده و نصر عبده و هزم الاحزاب وحده»

জনগণ কা’বার খেদমত এবং হাজীদেরকে পানি দেওয়া ছাড়া সকল পদ ও পদবীকে উপেক্ষা করল। মহানবি (সা.) ২ সপ্তাহ মক্কায় অবস্থান করলেন। এ সময় তিনি মক্কা শহর পরিচালনা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজকর্ম গোছানোর কাজে মনোনিবেশ করলেন। এছাড়া কিছু লোককে মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে পাঠালেন মূর্তির ঘরগুলো ভেঙ্গে দিতে। হযরত আলীর (আ.) সহযোগিতায় তিনি কা’বার ভেতরে থাকা সকল মূর্তিও ভেঙ্গে ফেললেন।

মক্কার জনগণের বিষয়ে মহানবির (সা.) আচরণ ইসলামের সহনশীলতা ও মহানবির (সা.) মহত্বকে মানুষের সামনে আরও স্পষ্ট করে দিল। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে মহানবি (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের উপর যেকোন ধরনের অমানবিক পদক্ষেপ নিতে পিছপা না হওয়া কুরাইশ ভয়ে ছিল, তিনি তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করবেন। যখন তারা তাঁর (সা.) মুখ থেকে শুনতে পেল যে, তিনি বলেছেন: তোমাদের সকলকে মুক্ত করলাম। তখন তারা আশ্বস্ত হল।[৮৮]

মক্কা বিজয় পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

মক্কায় তাঁর অবস্থানের মেয়াদ ১৫ দিনও হয়নি, এর মধ্যে ইসলাম গ্রহণ না করা আরব উপদ্বীপের বেশ কয়েকটি বড় গোত্র মহানবির (সা.) বিরুদ্ধে জোট বাধল। মহানবি (সা.) বিশাল মুসলিম বাহিনী নিয়ে মক্কা থেকে বের হলেন। মুসলিম বাহিনী হুনাইন নামক উপত্যকায় পৌঁছালে পূর্ব থেকে ওঁৎপেতে থাকা শত্রু পক্ষ শিলাবৃষ্টির মতো তীর ছোঁড়া শুরু করে। এতে মুসলিম বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং তাদের কিছু সংখ্যক সৈন্য ছাড়া অবশিষ্টরা রনাঙ্গন ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। কিন্তু পলায়নরত মুসলিম সৈন্যরা হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের উচ্চকণ্ঠে মহানবির (সা.) আহবান শুনে ফিরে আসে এবং নব উদ্যমে শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদেরকে পরাজিত করে।[৮৯]

তাবুকের যুদ্ধ

৯ম হিজরীতে মহানবি (সা.) অবগত হলেন, রোমীয়রা বিশাল এক বাহিনী নিয়ে ‘বালকা’ নামক স্থানে তাবু ফেলেছে। উদ্দেশ্য মুসলমানদের উপর আক্রমন করা। প্রচন্ড গরমের মৌসুম এবং ফল পাড়ার সময়ও কাছাকাছি। জনগণ বাড়িতে থেকে বিশ্রাম করাকেই প্রাধান্য দিচ্ছিল, অপরদিকে কোষাগারও ছিল প্রায় শূন্য। মহানবি (সা.) বাহিনীকে রওনা করার সময় সাধারণত লক্ষ্য নির্ধারণ করতেন না, কিন্তু তাবুকের যুদ্ধ প্রচন্ড কষ্টসাধ্য হওয়ায় তিনি ঘোষণা দিলেন যে, রোমীয়দের সাথে যুদ্ধে যেতে চান। একটি দল বলল: গ্রীস্মের মৌসুম, এ সময় যাবেন না! এ মনোভাব পোষণকারী দলটি নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে তিরস্কৃর হল:

وَقَالُوا لَا تَنفِرُ‌وا فِی الْحَرِّ‌ ۗ قُلْ نَارُ‌ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّ‌ا ۚ لَّوْ کانُوا یفْقَهُونَ (ترجمه: و گفتند در گرما کوچ مکنید. بگو گرمی آتش دوزخ سختتر است اگر می‌دانستند.)[ ۹–۸۱]

‘(তাবুক অভিযানে) যারা পিছনে থেকে গিয়েছিল তারা রসূলের বিরোধিতায় বসে থাকাতেই আনন্দ প্রকাশ করেছিল আর তাদের ধন-সম্পদ ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করতে তারা অপছন্দ করেছিল। তারা বলেছিল, ‘গরমের মধ্যে অভিযানে বেরিও না’। বল, ‘জাহান্নামের আগুনই তাপে প্রচন্ডতম’। তারা যদি বুঝত!’[৯০]

এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার।[৯১] ঐ সময় পর্যন্ত এ ছিল মুসলমানদের সবচেয়ে বৃহৎ বাহিনী এবং তৎকালীন আরব এলাকায় এতবড় সেনা সমাবেশও ছিল বিরল। এ যুদ্ধে মহানবি (সা.) আলী ইবনে আবি তালিবকে (আ.) সঙ্গে নিলেন না। মুনাফিকরা বলতে লাগল, আলী (আ.) এ সফরে তাঁর সফরসঙ্গী হোক এটা তাঁর (সা.) অপছন্দ। এ বিষয় হযরত আলী (আ.) যখন মহানবিকে (সা.) অভিযোগ করলেন তিনি (সা.) উত্তরে বললেন: আমি তোমাকে আমার খলিফা ও স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেছি, তোমার অবস্থান আমার নিকট ঠিক তেমন যেমন ছিল হারুনের অবস্থান মুসার কাছে, শুধু পার্থক্য এতটুকু যে, আমার পরে আর কোন নবি আসবে না’।

তৃষ্ণায় প্রাণ ওষ্টাগত মুসলিম বাহিনী তাবুকে পৌঁছে বুঝতে পারল রোমীয়দের সেনা সমাবেশের তথ্য সঠিক ছিল না। মহানবির (সা.) জীবদ্দশায় তাবুকের যুদ্ধ ছিল অমুসলিমদের সাথে মুসলমানদের শেষ যুদ্ধ। এরপর আরাবিস্তানের সকল এলাকা আত্মসমার্পন করে। এ যুদ্ধের পর মহানবির (সা.) প্রতি আনুগত্য ও ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিতে প্রতিটি গোত্র প্রতিনিধি প্রেরণ করল এবং বলা যায় সকল গোত্রই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। আর এ কারণেই বছরটিকে ‘সানাতুল উফুদ’ (উফুদ হল ওয়াফ্‌দ শব্দের বহুবচন, এর অর্থ হল প্রতিনিধি দল বা মেহমানবৃন্দ)[৯২]

সানাতুল উফুদ

মক্কা বিজয়ের পর বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধি মহানবির (সা.) কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করল এবং আনুগত্যের ঘোষণা দিল। মহানবিও (সা.) সম্মান ও সাগ্রহে তাদেরকে গ্রহণ করলেন। আর এ কারনে বছরটি ‘সানাতুল উফুদ’ নামে প্রসিদ্ধ হল।[৯৩]

মুবাহালার ঘটনা

৯ম হিজরীতে বিভিন্ন অঞ্চলের বাদশাদেরকে পত্র পাঠানোর সময় মহানবি (সা.) নাজরানের প্রধান ধর্মযাজকের বরাবরও পত্র পাঠিয়ে ঐ এলাকার জনগণকে ইসলামের প্রতি আহবান জানান। খ্রিষ্টানরা মহানবির (সা.) সাথে কথা বলতে এবং তাঁর দাবীর বিষয়টি পর্যালোচনা করতে একটি প্রতিনিধি দল মদিনায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিনিধি দলটি মদিনায় মসজিদে নববিতে মহানবির (সা.) সাথে আলোচনায় বসল। উভয় পক্ষ নিজেদের আকিদা সত্য হওয়ার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি ও দলীল উপস্থাপন করার পর কোন ফলাফল না হওয়ায় সিদ্ধান্ত হল, মুবাহালার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে। অর্থাৎ উভয় পক্ষ পরস্পরের উপর অভিসম্পাত করবে। এরই ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হল আগামীকাল উভয় পক্ষ মদিনা শহরের বাইরে মরুভূমিতে সমবেত হবে।

মোবাহালার দিন সকালে মহানবি (সা.) আলী ইবনে আবিতালিবের (আ.) বাড়িতে এলেন। ইমাম হাসানের (আ.) হাত ধরলেন এবং ইমাম হুসাইনকে (আ.) কোলে নিলেন। অতঃপর আলী (আ.) ও ফাতেমাকে (সা. আ.) সঙ্গে নিয়ে মোবাহালার ময়দানের উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে বের হলেন। নাজরানের খ্রিষ্টানরা তাদেরকে দেখে মুবাহালা করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অন্য কোন উপায়ে নিষ্পত্তির আহবান জানায়[৯৪] এবং জিজিয়া কর প্রদানে সম্মত হয়ে মুবাহালায় ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করে।

মহানবির (সা.) বিদায় হজ্জ

১০ম হিজরীর যিলক্বদ মাসে মহানবি (সা.) জীবনের শেষ হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। এ সফরে তিনি মুসলমানদেরকে হজ্জের বিধি-বিধান চাক্ষুষভাবে শিখিয়ে দিলেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কুরাইশ কিছু কিছু বিষয়ে নিজেদেরকে অন্যান্য হাজীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়েছিল। কা’বার চাবীর বাহক, পর্দার সংরক্ষক, হাজীদেরকে পানি পান করানো ও তাদেরকে আপ্যায়ন করা ছাড়াও যিয়ারত সংশ্লিষ্ট কিছু কিছু বিষয়ে অন্য গোত্র থেকে তারা নিজেদেরকে আলাদা করে রাখত। আল্লাহর গৃহ যিয়ারতের ক্ষেত্রে কুরাইশ যে সকল বিষয়ে নিজেদেরকে আলাদা করে রাখত এবং অন্যদেরকে তা থেকে বঞ্চিত করত, মহানবি (সা.) ভিত্তিহীন ঐসব প্রথার ইতি টানলেন। ঐ প্রথাগুলোর মধ্যে ছিল, জাহিলিয়্যাতের যুগে মানুষের বিশ্বাস ছিল, কা’বার তাওয়াফ অবশ্যই পবিত্র পোশাকে আঞ্জাম দিতে হবে, আর পোশাক তখনই পবিত্র হবে যখন তা কুরাইশের কাছ থেকে নেয়া হবে। এ কারণে যদি কুরাইশ কাউকে পোশাক না দিত তাহলে তাকে নগ্ন অবস্থায় তাওয়াফ করতে হত।

অপর বিষয়টি হল আরাফায় যাওয়া ও না যাওয়া নিয়ে। আরাফায় অবস্থান করার বিষয়টি জরুরী হলেও হারাম এলাকার বাইরে হওয়ায় মক্কার কুরাইশরা আরাফা পর্যন্ত যেত না, তারা মুযদালিফা থেকেই ফিরে আসত। কিন্তু নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ্ তাদের এ কুপ্রথাকে বাতিল ঘোষণা করেন; ثُمَّ أَفِیضُوا مِنْ حَیثُ أَفَاضَ النَّاسُ অতঃপর (কুরাইশের মত আরাফায় না গিয়েই কেবল মুযদালিফা থেকে না ফিরে অন্য) লোকেরা যেখান থেকে ফিরে, সেখান থেকেই (আরাফাত থেকে মুযদালিফায়) ফিরে চল।[৯৫] হাজীরা দেখল যে, মুহাম্মাদ (সা.) নিজে কুরাইশ হয়েও আরাফাত থেকে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। এ সফরেই তিনি বললেন; হে লোকসকল! আমি জানি না আগামি বছর তোমাদের মাঝে থাকব কি না। জাহিলিয়্যাতের যুগে যে রক্ত ঝরেছে সেগুলো থেকে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। (কিন্তু এরপর থেকে) তোমাদের রক্ত ও সম্পদ পরস্পরের জন্য হারাম।

গাদীরে খুমের ঘটনা

মদিনায় ফেরার পথে ‘জোহফা’র গাদীরে খুম এলাকা; মিসর, হিজাজ ও ইরাকের পথিকদের পথ এখান থেকে পৃথক হয়ে যাবে। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবি (সা.) নির্দেশিত হলেন যেন আলীকে (আ.) নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ঘোষণা দেন। অন্য ভাষায় তাঁর (সা.) অবর্তমানে মুসলিম উম্মাহর অভিভাবককে পরিচয় করিয়ে দেন। আল্লাহর রসূল (সা.) মুসলমানদের মাঝে -যাদের সংখ্যা ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ বর্ণিত হয়েছে- প্রদত্ত দীর্ঘ খোতবায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি বর্ণনার পর তাঁর পরবর্তীত সময়ে মুসলমানদের অভিভাবককে এভাবে পরিচয় করালেন:

من کنت مولاه فعلیّ مولاه. اللّهم وال من والاه و عاد من عاداه و أحب من أحبه و أبغض من أبغضه و انصر من نصره و اخذل من حذله و أدر الحق معه حیث دار.

সুতরাং হে লোকসকল! আমি যার মাওলা (অভিভাবক), এই আলীও তার মাওলা (অভিভাবক)। হে আল্লাহ! যে তাকে সমর্থন করবে তাকে তুমিও সমর্থন কর; যে তার সাথে শত্রুতা করবে, তার সাথে তুমিও শত্রুতা কর; যে তাকে ভালোবাসবে, তাকে তুমিও ভালোবাস; যে তাকে ঘৃণা করবে, তাকে তুমিও ঘৃণা কর; যে তাকে সাহায্য করবে, তাকে তুমিও সাহায্য কর এবং যে তাকে সাহায্য থেকে বিরত থাকবে, তাকে তুমিও সাহায্য করা থেকে বিরত থাক এবং সে যেদিকে ঘোরে, সত্যকেও তার সাথে সেদিকে ঘুরিয়ে দাও। উপস্থিতরা এ বার্তা অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেবে’।

মহানবি (সা.) হজ্জ পালন শেষে মদিনায় ফিরে এলেন। দিনের পর দিন ইসলামের শক্তি ও প্রভাব বেড়েই চলছিল। মদিনায় ফিরে তিনি (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিন্তু অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও মোতা’র যুদ্ধের পরাজয়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উসামা বিন যাইদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করলেন এবং সবাইকে ঐ বাহিনীতে যোগদানের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু ঐ বাহিনী রওনা হওয়ার আগেই মহানবি (সা.) মহান প্রতিপালকের সান্নিধ্য লাভ করেন। ওফাতের পূর্বে তিনি গোটা জাজিরাতুল আরবে ইসলামি ঐক্য কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং ইসলামকে বৃহৎ ইরান ও রোম সম্রাজ্যের সম্মুখে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মহানবির (সা.) ওফাত

১১তম হিজরীর শুরুর দিকে মহানবি (সা.) অসুস্থ হলেন। তাঁর (সা.) অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি মিম্বরে গিয়ে মুসলমানদেরকে পরস্পরের সাথে দয়াসুলভ আচরণের তাকীদ করে বললেন: যদি কারও অধিকার আমার কাঁধে থাকে তাহলে হয় সে অধিকারের দাবী তুলে নিক অথবা যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে আমি তাকে শোধ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।[৯৬]

দোয়াত ও কাগজের হাদীস

আহলে সুন্নতের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সহীহ আল-বুখারীর বর্ণনার ভিত্তিতে, আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজের জীবনের শেষদিনগুলোর একদিন একদল সাহাবী তাকে দেখতে গেলেন, যদিও তাদের উপর নির্দেশ ছিল উসামার বাহিনীতে যোগদানের, কিন্তু তারা তা অমান্য করে আল্লাহর নবিকে দেখতে যান। তিনি তাদেরকে বললেন: আমাকে কাগজ ও কলম এনে দাও, তোমাদের জন্য এমন কিছু লিখে দেই যার ফলে তোমরা কখনই বিভ্রান্ত হবে না। উপস্থিতদের একজন বলল: আল্লাহর রাসূলের (সা.) অসুস্থতা তীব্রতর হয়েছে (এবং তিনি প্রলাপ বকছেন), আমাদের কাছে কুরআন রয়েছে আর তা আমাদের জন্য যথেষ্ঠ। এ সময় উপস্থিতদের মাঝে দ্বন্দ্ব দেখা দিল এবং তারা শোরগোল করতে লাগল। তাদের কেউ বলল: কাগজ ও কলম এনে দাও যাতে তিনি সে মূল্যবান উপদেশ লিখে দিতে পারেন, আবার কেউ বাধা দিল। এ সময় আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন: আমার কাছ থেকে চলে যাও।[৯৭]

আহলে সুন্নতের অপর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সহীহ মুসলিমের বর্ণনার ভিত্তিতে মহানবির (সা.) বিরোধিতাকারী ব্যক্তি ছিলেন ‘উমর ইবনে খাত্তাব’। একই গ্রন্থে এবং সহীহ বুখারীতেও বর্ণিত হয়েছে যে, ইবনে আব্বাস সবসময় এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতেন এবং একে বৃহৎ মুসিবত বলে আখ্যায়িত করতেন।[৯৮] মহানবি (সা.) ১১ হিজরীর ২৮ সফর[৯৯] অন্য এক বর্ণনায় একই সনে ১২ রবিউল আওয়াল ৬৩ বছর বয়সে ওফাত প্রাপ্ত হন। যেভাবে নাহজুল বালাগাতে উল্লিখিত হয়েছে, বিদায় বেলা মহানবির (সা.) মাথা মোবারক হযরত আলীর (আ.) বক্ষ ও গর্দানের মাঝামাঝি।[১০০] ইন্তিকালের সময় হযরত ফাতেমা (সা. আ.) ব্যতীত তাঁর (সা.) আর কোন সন্তান জীবিত ছিলেন না। ইব্রাহিম (আ.)-সহ তাঁর অপর সন্তানরা তাঁর ইন্তেকালের পূর্বেই ইন্তেকাল করেছিলেন। হযরত আলী (আ.) তাঁর (সা.) দেহ মোবারককে বনি হাশিমের কয়েকজনের সহযোগিতায় গোসল দেন ও কাফন পরান এবং তাকে মসজিদুন নাবির (সা.) অভ্যন্তরে দাফন করা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রের বর্ণনার ভিত্তিতে, দু’ ব্যক্তিকে ডেকে পাঠানো হল একজন মক্কার প্রচলিত নিয়মে কবর খুঁড়ত আরেকজন মদিনার। কিন্তু কোন নিয়মে কবর খোঁড়া হবে তা নিয়ে মুসলমানদের মাঝে ইখতিলাফ দেখা দিল। সিদ্ধান্ত হল যে আগে পৌঁছুবে তার নিয়মেই কবর খোঁড়া হবে। আবু তালহা আনসারি আগে পৌঁছুলেন এবং বিশ্বনবির (সা.) কবর মদিনায় প্রচলিত নিয়মে খোঁড়া হল।[১০১]

সাকীফার ঘটনা

আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) ও বনি হাশিম যখন মহানবির (সা.) গোসল ও কাফনের কাজে ব্যস্ত তখন মদিনার (আনসার) বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটি দল সাকীফায়ে বনি সায়াদাহ’তে মিলিত হয়ে খলিফা নির্বাচনের বিষয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হল তাদের মাঝে মুহাজিরদেরও একটি দল উপস্থিত ছিল। অবশেষে তারা আবু বকরের খেলাফতে সম্মত হল এবং গাদীরে খুমে মুসলমানদের মাওলা ও অভিভাবক হিসেবে হযরত আলীকে (আ.) মহানবি (সা.) যে মনোনয়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন তা অমান্য করল। এ ঘটনার পর তারা মদিনায় প্রবেশ করে মদিনা শহরে উপস্থিত লোকদের থেকে জোরপূর্বক বাইয়াত গ্রহণ শুরু করে।[১০২]

মহানবির (সা.) জীবন চরিত ও তাঁর ব্যক্তিত্ব

মহানবির (সা.) আচার-ব্যবহার সম্পর্কে -যাকে সিরাতে নববি বলা হয়- ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গ্রন্থ ও বিভিন্ন গবেষণা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাঁর (সা.) সম্পর্কে বলেছেন:

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে...।’[১০৩]

এ আয়াতর প্রতি দৃষ্টি রেখে মহানবির (সা.) আচার-ব্যবহার সম্পর্কে পরিচিতি অর্জনের বিষয়ে মুসলমানরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।[১০৪] উদাহরণ স্বরূপ কিছু নমুনা এখানে উল্লেখ করা হল:

তাঁর (সা.) সুখ্যাতি

বে’সাতের পূর্বে ৪০ বছর তিনি সাধারণ মানুষের মাঝে জীবন যাপন করেছেন, আর এ সময় তার কাজ-কর্ম ও আচার-আচরণে কোন ধরনের দ্বিমুখিতা, অপছন্দনীয় কোন বৈশিষ্ট এবং তাঁর মাঝে অপ্রীতিকর কোন অবস্থা পরিলক্ষিত হয় নি। মানুষের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন সত্যবাদি ও আমানতদার। পরবর্তীতে মহানবি (সা.) যখন নিজের রেসালাতের প্রচার শুরু করেন তখন মক্কার মুশরিকরা ব্যক্তি মুহাম্মাদকে (সা.) কখনও মিথ্যা প্রতিপন্ন করত না বরং তাঁর আনীত আয়াতকে অস্বীকার করত। আর এ বিষয়টি পবিত্র কুরআনেও এসেছে: ‘তারা তোমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করে না বরং (এই) অত্যাচারীরা ঐশী আয়াতগুলোকে অস্বীকার করে।’[১০৫] আবু জাহল থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, সে বলত: আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করি না বরং তোমার আয়াতগুলোকে আমরা মানি না।[১০৬] নিজের দাওয়াত কুরাইশের সামনে উপস্থাপনের আগে মহানবি (সা.) কুরাইশের উদ্দেশ্যে বললেন: ‘যদি তোমাদেরকে বলি, এ পাহাড়ের পেছনে একদল সৈন্য তোমাদের উপর আক্রমনের অপেক্ষায় রয়েছে, তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? সকলে বললো: হ্যাঁ, আমরা কখনই তোমার থেকে মিথ্যা শুনিনি। তখন মহানবি (সা.) বললেন যে, তিনি (সা.) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে জনগণকে ভীতি প্রদর্শন ও সতর্ক করার লক্ষ্যে প্রেরিত হয়েছেন।[১০৭]

এছাড়া তার অবস্থান ও সফলতার নেপথ্যে তার বংশ ও গোত্রের ভূমিকার বিষয়টিও অনস্বীকার্য। আরবদের মাঝে কুরাইশ গোত্র ছিল বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। আর এ মর্যাদার কারণে অনেক গোত্রে নিজেদের উপর তাদেরকে প্রাধান্য দিত এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাদেরকে অনুসরণ করত। অপরদিকে মহানবির (সা.) পূর্বপুরুষগণ (কুছাই বিন কালাব, হাশিম ও আব্দুল মুত্তালিব) আরবদের মাঝে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও সম্মানের পাত্র ছিলেন।

তৎকালীন জাজিরাতুল আরব অঞ্চলটি ছিল বদ্ধ এবং অন্যান্য অঞ্চলের সাথে তাদের কোন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল না। আর এ অবস্থার কারণে তাদের মাঝে ‘আরব’ কেন্দ্রীক মনোভাবের উপস্থিতি ছিল প্রবল। আর তাই নিজেদের গণ্ডির বাইরের কারও কথা যেহেতু সে অগান্তুক তাই গ্রহণ করত না। সম্ভবত নিম্নোক্ত আয়াতটি

وَلَوْ نَزَّلْنٰهُ عَلٰى بَعْضِ الْاَعْجَمِيْنَ * فَقَرَاَهٗ عَلَيْهِمْ مَّا كَانُوْا بِهٖ مُؤْمِنِيْنَ ۗ

আমি যদি তা কোন অনারবের প্রতি অবতীর্ণ করতাম, অতঃপর সে তা তাদের নিকট পাঠ করত, তাহলে তারা তাতে বিশ্বাস আনত না।[১০৮] আরবদের ঐ মনোভাবের প্রতিই নির্দেশ করে। যেহেতু ইসলামের প্রতি দাওয়াত সর্বপ্রথম আরবদের থেকে শুরু হয় এ কারণে মহানবির (সা.) তাদেরই একজন হওয়াটা তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়টিকে আরও সহজ করে দিয়েছিল, কুরআন এ বিষয়টির প্রতিও ইঙ্গিত করেছে।[১০৯]

মহানবি (সা.)-এর নৈতিকতা

মহানবির (সা.) সর্বোৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে স্পষ্ট বৈশিষ্টটি ছিল তাঁর আখলাক ও নৈতিকতা। পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে : ‘আর নিঃসন্দেহ তুমি সুমহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ [১১০]

মহানবি (সা.)-এর আচার-আচরণ ও বৈশিষ্টের বিষয়ে বলা হয়েছে যে, তিনি বেশীরভাগ সময় নিরব থাকতেন এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশী কথা বলতেন না। কখনই সম্পূণ মুখ খুলতেন না, মুচকি হাসতেন এবং উচ্চৈস্বরে হাসতেন না। যখন কারো দিকে তাকাতে চাইতেন তখন নিজের সমস্ত শরীর তার দিকে ঘুরিয়ে নিতেন। পবিত্রতা-পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধি অত্যধিক পছন্দ করতেন এবং যে স্থান দিয়ে তিনি অতিক্রম করতেন তাঁর পরে আগত পথিকরাও তাঁর উপস্থিতির সুগন্ধি পেত।

তাঁর জীবন ছিল খুবই সাধাসিধে। তিনি মাটিতে বসতেন, মাটিতে বসেই খাবার খেতেন এবং কখনই অহংকার করতেন না। কখনই পেট পূর্ণ করে খাবার খেতেন না। অনেক সময় তিনি ক্ষুধার্ত থেকেছেন বিশেষ করে মদিনায় আগমনের প্রথম দিকে। এত কিছুর পরও তিনি সন্যাসীদের মত জীবন-যাপন করতেন না এবং নিজেই বলতেন, প্রয়োজন অনুযায়ী দুনিয়ার নিয়ামত থেকে উপকৃত হয়েছেন, আবার রোজাও রেখেছেন এবং ইবাদতও করেছেন। মুসলমানদের সাথে এমনকি অন্যান্য ধর্মের বিশ্বাসীদের সাথে তার আচরণ ছিল সহানুভূতি, উদারতা, ক্ষমা এবং দয়ার উপর ভিত্তি করে। তাঁর জীবনী এতটাই পছন্দনীয় ও মুসলমানদের জন্য এতটাই আনন্দদায়ক ছিল যে, এর প্রতিটি বিবরণ এক প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বর্ণনা করেছে এবং আজও তারা এটিকে তাদের জীবন ও দ্বীনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।[১১১]

তাঁর নম্রতা এমন ছিল যে তিনি একজন দাসের মতো খেতেন এবং মাটিতে বসতেন। ইমাম সাদিক (আ.) এর ভাষায়: ‘তিনি মাবউস (নবুয়্যতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা) হওয়ার পর কখনও হেলান দিয়ে খাবার খাননি। [১১২]

আমিরুল মুমিনীন নবী (সা.)-এর চেহারা ও ব্যক্তিত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন: ‘পূর্ব পরিচয় ছাড়া যে কেউ তাঁকে দেখেছে সে বিস্মিত ও তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। যারাই তাঁর সাথে মেলামেশা করত এবং তাঁর সাথে পরিচিত হত তারাই তাঁর বন্ধু হয়ে যেত। [১১৩] তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে সমান চোখে দেখতেন।[১১৪] আল্লাহর রসূল (সা.) কারও সাথে করমর্দন করার সময় কখনও এমন হয়নি যে, তিনি প্রথমে হাত টেনে নিয়েছেন বরং অপরজন নিজ হাত টেনে না নেয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতেন।[১১৫] প্রত্যেকের বুঝ অনুযায়ী তিনি (সা.) তার সাথে কথা বলতেন।[[১১৬] তাঁর উপর জুলুমকারীকে ক্ষমা করার বিষয়টি সম্পর্কে সকলে জানত।[১১৭] এমনকি (তাঁর (সা.) চাচা হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিবের (রা.) হত্যাকারী) ওয়াহশি ও ইসলামের চিরশত্রু আবু সুফিয়ানকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন।

ওয়াহশির ইসলাম গ্রহণ এবং হযরত হামযাকে (রা.) হত্যার বিবরণ শুনে তাকে ক্ষমা করে দিয়ে বললেন: নিজেকে আমার দৃষ্টি থেকে দূরে রাখবে (আমার চোখের সামনে আসবে না)।[১১৮]

দুনিয়া বিমুখতা

নবি (সা.) ছিলেন দুনিয়াবিমুখ। তার নিজস্ব কোন কক্ষ ছিল না। স্ত্রীদের জন্য কাদা দিয়ে তৈরি মসজিদ সংলগ্ন কক্ষগুলোতেই তিনি থাকতেন, যাতে ছিল খেজুরের কাঠের তাক। কামরাগুলোতে দরজার পরিবর্তে, ছাগলের লোম বা উটের পশমের তৈরি পর্দা ঝুলানো ছিল। মাথায় যে বালিশটি দিতেন তাতে খেজুরের পাতা ভর্তি করা হয়েছিল। খেজুরের পাতায় ভরা একটি চামড়ার গদি ছিল, ওটার উপরই তিনি সারা জীবন ঘুমিয়েছেন। তাঁর অন্তর্বাস ছিল রুক্ষ কাপড়ের তৈরি যা শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি করত এবং তিনি উটের পশমের তৈরি আবা পরতেন। অথচ হুনাইনের যুদ্ধের পর তিনি চার হাজার উট, চল্লিশ হাজারেরও বেশি ভেড়া এবং প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণ-রৌপ্য মানুষের মাঝে বিলিয়েছিলেন। বাড়িতে তৈরি খাবার খেতেন, আসবাবপত্র ও জামাকাপড় ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। অনেক সময় মাস পেরিয়ে গেছে তবুও তার ঘরে চুলা জ্বলেনি, খেজুর ও জবের রুটি খেয়ে তাঁর (সা.) দিন কেটেছে। পরপর দুদিন কখনও পেট ভর্তি করে খাবার খাননি। একদিনে দু’বেলা পেট ভরে খেয়ে দস্তরখান থেকে উঠতেন না। প্রায়শই এমন ঘটনা ঘটত যে, তিনি ও তাঁর সাথের লোকেরা রাতে ক্ষুধার্ত ঘুমিয়েছেন। একদিন ফাতিমা (সা. আ.) তাঁর (সা.) জন্য কিছু জবের রুটি এনে বললেন: আমি কিছু রুটি বানিয়েছি, আপনাকে না দিয়ে খেতে পারিনি। তিনি তা খেয়ে বললেন, তিনদিনে এটাই তোমার বাবার একমাত্র খাবার। একদিন এক আনসারের খেজুর বাগানে খেজুর খাওয়ার সময় বললেন, এই চতুর্থ দিন আমি উপবাসে রয়েছি। ক্ষুধার তীব্রতা কমাতে কখনো কখনো পেটে পাথর বেঁধে রাখতেন। মৃত্যুর সময়, তাঁর বর্মটি ত্রিশ বাটি যবের বিনিময়ে এক ইহুদির কাছে বন্ধক ছিল।[১১৯]

শৃঙ্খলা ও পরিপাটি

মহানবির (সা.) জীবন ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। মসজিদের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার পর তিনি প্রতিটি খুঁটির জন্য আলাদা নাম রাখলেন, যাতে বোঝা যায় কোন খুঁটিতে কি কাজ হচ্ছে। যেমন: প্রতিনিধিদল ও অতিথিদের বসার খুঁটি এবং তাহাজ্জুদের নামাজের খুঁটি ইত্যাদি।[১২০] নামাজের সারিগুলোকে এমন সোজা ভাবে দাঁড় করাতেন যেন তীরের দণ্ড সোজা করছেন এবং বলতেন: ‘হে আল্লাহর বান্দারা তোমাদের সারিগুলোকে সোজা করে নাও, তা না হলে তোমাদের অন্তরগুলোর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি হবে।[১২১] দৈনন্দিন জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। নিজের সময়কে ৩ ভাগে ভাগে ভাগ করতেন, একাংশ আল্লাহর ইবাদতের জন্য, একাংশ পরিবারের জন্য এবং আরেক অংশ নিজের জন্য। অতঃপর নিজের অংশের সময়কে নিজের এবং মানুষের মাঝে ভাগ করে নিতেন।[১২২]

মহানবি (সা.) আয়না দেখতেন, নিজের চুল পরিপাটি করতেন ও আচড়াতেন, শুধু নিজের স্ত্রী ও পরিবারের জন্য পরিপাটি হতেন না বরং নিজেদের সাথীদের জন্যও পরিপাটি থাকতেন।[১২৩] সফরে বাহ্যিকভাবে পরিপাটি থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন। আর সবসময় ৫টি জিনিস তাঁর সাথে থাকত; আয়না, সুরমা, চিরুনি, মেসওয়াক ও কাঁচি।[১২৪]

উম্মি নবি

মহানবি (সা.) ক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনে তাঁকে উম্মি নবি হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে, এর অর্থ হল পড়া ও লেখার সাথে পরিচিত না থাকা।[১২৫] পবিত্র কুরআনে মহানবির (সা.) উম্মি হওয়াটা এমন এক বৈশিষ্ট হিসেবে উল্লেখ করছে, যে বৈশিষ্টের মাধ্যমে তাওরাত ও ইঞ্জিলে মহানবিকে (সা.) পরিচয় করানো হয়েছে।[১২৬]

উম্মী হওয়াটা বিশ্বনবীর (সা.) জন্য একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচিত; কারণ জ্ঞান অর্জনের জন্য লেখা-পড়া করার মতো অক্ষরজ্ঞান তাঁর ছিল না, কিন্তু তিনি আসমানী জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন এবং মানুষের জন্য পথপ্রদর্শন ও পরিত্রাণের উপাদান প্রস্তুত করেছিলেন।[১২৬. মুগনিয়া, তাফসীরুল কাশেফ, ১৪৪৩ হি., খণ্ড ৩, পৃ. ৪০৪] গবেষকদের মতে, লেখা ও পড়া না শেখা এক ব্যক্তির জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পূর্ণ কোরআন নিয়ে আসা, প্রকৃত অর্থে একটি মুযিজা। [১২৭]

অমীয়বাণী

  • প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রেখে পেট ভর্তি করে মু’মিন খায় না।[১২৮]
  • মু’মিন ওঁৎপেতে থেকে কারও রক্ত ঝরায় না।[১২৯]
  • ঈমানহীন আমল এবং আমল হীন ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়।[১৩০]
  • ৩টি জিনিস যদি কারো মাঝে না থাকে তাহলে তার কাজ সমাধা হবে না; এমন তাক্বওয়া যা তাকে পাপ থেকে বিরত রাখে, এমন আখলাক যা তাকে জনগণের সাথে সহনশীল হতে শেখায়, এমন সহিষ্ণুতা যার মাধ্যমে সে তুচ্ছতাচ্ছিল্যকারীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্যকে প্রতিহত করতে পারে।[১৩১]

অসহায়ের উপকার সাধন ও আত্মীয়তার বন্ধন জোড়া লাগানোর প্রতিদান অন্য সৎকাজ অপেক্ষা দ্রুত পৌঁছায় এবং জুলুম ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি অন্যান্য মন্দ কর্ম অপেক্ষা দ্রুত পৌঁছায়।[১৩২]

  • ৩টি জিনিস ধর্মের জন্য ক্ষতিকর; অসৎকর্মশীল জ্ঞানী ব্যক্তি, অত্যাচারী শাসক এবং মূর্খ পরিশ্রমী ও চেষ্টাকারী।[১৩৩]
  • মহান আল্লাহর নিকট সর্বনিকৃষ্ট হালাল হচ্ছে ‘তালাক’।[১৩৪]
  • দুস্থ ও অভাবীদের সাথে বন্ধুত্ব করো, কারণ কিয়ামতের দিন তারা বড় সম্পদের অধিকারী হবে।[১৩৫]

মহান আল্লার নিকট তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা হল সে যে আল্লাহর বান্দাদের জন্য অধিক উপকারী ও কাজের সাব্যস্ত হয়।[১৩৬]

  • তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হল তারা, যারা নিজের স্ত্রীদের জন্য ভাল হয়।[১৩৭]

আমার উম্মতের মধ্যে দু’টি দল সংশোধিত হলে আমার উম্মত সংশোধিত হবে, আর যদি তারা ফাসিদ (চরিত্রহীন) হয়ে যায় তাহলে আমার উম্মতও ফাসিদ (চরিত্রহীন) হয়ে যাবে। তাঁকে (সা.) জিজ্ঞেস করা হল; হে আল্লাহর রাসূল! ঐ দু’টি দল কারা। তিনি (সা.) বললেন: ফকীহ ও শাসকগণ।[১৩৮]

শিয়া আকিদায় মহানবির (সা.) স্থান ও মর্যাদা

শিয়া আকিদার ভিত্তিতে, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হলেন আল্লাহর নবি ও রসূল। আর যেহেতু তিনি খাতামুল আম্বিয়া এজন্য তারপর আর কোন নবি আসবে না। তিনি (সা.) উলুল আযম নবিগণের একজন এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য নতুন শরিয়ত এনেছেন। ১৪ জন মাসুমের মাঝে আল্লাহর নবি (সা.) হলেন প্রথম ব্যক্তি। তিনি শুধুমাত্র ওহি গ্রহণে ইসমাত তথা নিষ্পাপত্বের অধিকারী নন বরং তিনি তার জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে ইসমাতের অধিকারী। মহানবি (সা.) বিভিন্ন মুযিজার অধিকারী, পবিত্র কুরআন হল তাঁর সবচেয়ে বড় মুজিযা। (মহানবির (সা.) মুজিযাসমূহ দ্রষ্টব্য)

মহানবির (সা.) রেওয়ায়েত কেন্দ্রীক রচিত গ্রন্থাবলি

মহানবির (সা.) হাদীস সমগ্র সংকলিত বিভিন্ন স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচিত হয়েছে অথবা শুধু হাদিসে নববি (সা.) নিয়ে বিশেষ অধ্যায় রচিত হয়েছে। ঐ সকল গ্রন্থাদির মধ্যে নিম্নের গ্রন্থগুলোর নাম উল্লেখযোগ্য:

  • হিজরী ৪র্থ শতাব্দির বিশিষ্ট আলেম ও ফকীহ ইবনে শো’বা হাররানী রচিত ‘তোহাফুল উকুল আন আলির রাসূল (সা.)’; এ গ্রন্থে মহানবি (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের (আ.) গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ ও বাণী সংকলিত হয়েছে এবং মহানবি (সা.) থেকে বর্ণিত হাদীসের জন্য স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে।
  • সাইয়্যেদ রাযি রচিত আল-মাজাযাতুন নাবাভিয়্যাহ; এতে মহানবির (সা.) গুরুত্বপূর্ণ বাণী বিষয়ভিত্তিক আকারে সংকলিত হয়েছে।
  • আলী আহমাদি মিয়ানজি রচিত ‘মাকাতীবুর রাসূল’; এতে বিভিন্ন অঞ্চলের শাসক ও সম্রাট, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, নির্বাহী কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে লেখা বিভিন্ন চিঠি ছাড়াও বিভিন্ন অঙ্গীকার নামা ও চুক্তি সহ বিবিধ বিষয় উল্লিখিত হয়েছে।
  • আল্লামা তাবাতাবায়ী রচিত ‘সুনানুন নাবি’; মহানবির (সা.) নৈতিকতা, তার আচার-আচরণ -যাকে নবীর সুন্নত বলা হয়- সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি কেন্দ্রীক রচিত হয়েছে।
  • আবুল কাসেম পায়ান্দেহ রচিত নাহজুল ফাসাহাহ; মহানবির (সা.) হাদীস ও খোতবাসমূহ দু’টি পৃথক অধ্যায়ে উল্লিখিত হয়েছে।

নিবন্ধটি আপডেট হবে...

তথ্যসূত্র

  1. তারিখে পায়াম্বারে ইসলাম, ১৩৭৮ সৌরবর্ষ, পৃ. ৪৩
  2. মাজলিসী, বিহারুল আনওয়ার, ১৪০৩ হি., খণ্ড ১৫, পৃ. ১১৭।
  3. তাবারসী, এ’লামুল ওয়ারা’, ১৪১৭ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৪৩।
  4. মুকাদ্দাসি, বায পেঝুহিয়ে তারিখে ভেলাদাত ওয়া শাহাদাতে মা’সুমীন, ১৩৯১ সৌরবর্ষ, পৃ. ৯১।
  5. সুবহানী, ফুরুগে আবাদিয়্যাত, ১৩৮০ সৌরবর্ষ, খণ্ড ১, পৃ. ১৫১।
  6. ইমাম খোমেনি, সাহিফায়ে ইমাম, খণ্ড ১৫, পৃ. ৪৪০ ও ৪৫৫।
  7. মাজলিসী, মিরআতুল উকুল, ১৪০৪ সৌরবর্ষ, খণ্ড ৫, পৃ. ১৭০।
  8. মাজলিসী, মিরআতুল উকুল, ১৪০৪ সৌরবর্ষ, খণ্ড ৫, পৃ. ১৭০
  9. আল-মাওয়াহেবুদ দ্বীনিয়্যাহ, খণ্ড ১, পৃ. ২৫।
  10. বায়হাকি, দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ, ১৪০৫ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৭৫।
  11. বায়হাকি, দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ, ১৪০৫ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৭৯।
  12. শাহিদী, তারিখে তাহলিলীয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৩৭।
  13. সীরাতুন নাভাভিয়্যাহ, খণ্ড ১, পৃ. ১৫৮; বায়হাকি, দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ, ১৪০৫ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৭৪।
  14. ইবনে হাবিব, আল-মুহাব্বার, বৈরুত, পৃ, ৮-৯।
  15. মুকাদ্দেসী, আল-বাদভ’ ওয়াত তারিখ, বুর সাঈদ, খণ্ড ৪, পৃ. ১৩২।
  16. ইবনুল ওয়ারদি, তারিখে ইবনুল ওয়ারদি, ১৯৯৬ হি., খণ্ড ১, পৃ ৯৩।
  17. মাকরিযি, ইমতাউল আসমা, ১৪২০ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৬।
  18. মাকরিযি, ইমতাউল আসমা, ১৪২০ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৬; ফাইয কাশানি, আল-ওয়াফি, ১৪০৬ হি., খণ্ড ৩, পৃ. ৭২২।
  19. সাবকি, আদ্ দ্বীনুল খালিছ আও ইরশাদুল খালক্ব, ১৯৭৭ খ্রি., খণ্ড ৫, পৃ. ৬৪।
  20. আমেলি, আস্ সাহিহ মিন সিরাতিন নাবি (সা.), ১৩৮৫ সৌরবর্ষ, খণ্ড ২, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
  21. মাজলিসী, মিরআতুল উকুল, ১৪০৪ হি., খণ্ড ৫, পৃ. ১৭৪।
  22. আমেলি, আস্ সাহিহ মিন সিরাতিন নাবি (সা.), ১৩৮৫ সৌরবর্ষ, খণ্ড ২, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
  23. রাসুলি মাহাল্লাতি, দারহায়ী আয তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৭১ সৌরবর্ষ, খণ্ড ১, পৃ. ১৪৫ ও ১৪৬।
  24. আবু নাঈম ইসফাহানি, দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ, ১৪১২ হি. খণ্ড ১, পৃ. ১৩৯।; বায়হাকি, দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ, ১৪০৫ হি., খণ্ড ১, পৃ. ১২৬ ও ১২৭।
  25. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৩৭-৩৮।
  26. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৩৮।
  27. ইবনে ইসহাক, সিরাতু ইবনে ইসহাক, ১৩৯৮ সৌরবর্ষ, পৃ. ৮১।
  28. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ১৪১-১৪২।
  29. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৩৯-৪০।
  30. ইবনে ইসহাক, সিরাতু ইবনে ইসহাক, ১৩৭৮ হি., পৃ ২৪৫।
  31. আয়াতি, তারিখে পায়াম্বারে ইসলাম, ১৩৭৮ সৌরবর্ষ, পৃ. ৬০-৬৫।
  32. ইবনে ইসহাক, সিরাতু ইবনে ইসহাক, ১৩৯৮ হি., পৃ. ২৪৫।
  33. আমেলি, আস্ সাহিহ মিন সিরিতিন নাবিয়্যিল আ’যাম, ১৩৮৫ সৌরবর্ষ, খণ্ড ২, পৃ. ২১৮; আমেলি, বানাতুন নাবি আম রাবায়েবুহু?, ১৪১৩ হি., পৃ. ৭৭-৭৯; কুফি, আল-ইস্তিগাসাহ, খণ্ড ১, পৃ. ৬৮।
  34. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৪০।
  35. আয়াতি, তারিখে পায়াম্বারে ইসলাম, ১৩৭৮ সৌরবর্ষ, পৃ. ৬৭।
  36. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৪১।
  37. আলাক্ব : ০১
  38. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৪১।
  39. ইবনে ইসহাক, সিরাতু ইবনে ইসহাক, ১৩৯৮ হি., পৃ, ১৩২, ১৩৮ ও ১৩৯; ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ২৬২
  40. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ২৬৪ ও ২৬৬।
  41. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ২৮১ ও ২৮২।
  42. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৪১-৪৪।
  43. আশ-শোআরা : ২১৪-২১৬।
  44. ইবনে ইসহাক, সিরাতু ইবনে ইসহাক, ১৩৯৮ হি., পৃ. ১৪৫ ও ১৪৬।
  45. তাবারি, তারিখুত তাবারি, খণ্ড ৩, পৃ. ১১৭২।
  46. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৪৯।
  47. ইবনে ইসহাক, সিরাতু ইবনে ইসহাক, ১৩৯৮ হি., পৃ. ১৫২; ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৫।
  48. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৪ ও ২৮৫।
  49. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৫১ ও ৫২।
  50. শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৫৩
  51. ইবনে ইসহাক, সিরাতু ইবনে ইসহাক, ১৩৯৮ হি., পৃ. ১৬৬ ও ১৬৭; শাহিদী, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৫৩।
  52. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ৬০-৬৩।; তাবারি, তারিখে তাবারি, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৪-৩৪৬।
  53. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৫৬।
  54. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৫৬-৫৯।
  55. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৫৯।
  56. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৫৯-৬০
  57. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৬০
  58. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৬০-৬৩।
  59. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ২, পৃ. ১৫০-১৫৩।
  60. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ২, পৃ. ১৪৭ এর পর থেকে।
  61. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৬৭-৬৮।
  62. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৬৮।
  63. আলে ইমরান : ৬৫-৬৭; আরও দেখুন হাজ্জ : ৭৮; শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৬৮-৬৯।
  64. তাবতাবায়ী, আল-মিযান, ১৩৯০ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৩৩‌১।
  65. তাবতাবায়ী, আল-মিযান, ১৩৯০ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৩৩‌১।
  66. বাকারাহ : ১৪২।
  67. কুলাইনি, আল-কাফী, খণ্ড ১, পৃ. ২৬।
  68. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৭২।
  69. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ২, পৃ. ২৪১।
  70. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৭৩।
  71. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৭৫।
  72. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৭৯-৮০।
  73. দেখুন; জাফারিয়ান, সিরিয়ে রাসুলে খোদা (সা.), ১৩৮০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৫০৪-৫২৩।
  74. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ২, পৃ. ১০৬।
  75. তাবারি, তারিখুত তাবারি, দারুত তুরাস, খণ্ড ২, পৃ. ৫৩৮-৫৫৫।
  76. ওয়াক্বেদি, আল-মাগ্বাযি, ১৪০৫ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৩৬৩ এর পর।
  77. ওয়াক্বেদি, আল-মাগ্বাযি, ১৪০৫ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৪০২-৪০৪; ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ২, পৃ. ২২৪।
  78. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৭৬-৮৭।
  79. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৮৭-৮৮।
  80. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৯০।
  81. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ৩, পৃ. ৩০২।
  82. ওয়াক্বেদি, আল-মাগ্বাযি, ১৪০৫ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৪০২-৪০৪; তাবারি, তারিখুত তাবারি, দারুত তুরাস, খণ্ড ৩, পৃ. ৯-১৬।
  83. আয়াতি, তারিখে পায়াম্বারে ইসলাম (সা.), ১৩৭৮, পৃ. ৪১০-৪১১।
  84. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৯০-৯১।
  85. দেখুন; শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৯১।
  86. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৯২।
  87. তাবারি, তারিখুত তাবারি, দারুত তুরাস, খণ্ড ২, পৃ. ৬৪৪ এর পর।
  88. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৯৪-৯৫।
  89. ওয়াক্বেদি, আল-মাগ্বাযি, ১৪০৫ হি., খণ্ড ২, পৃ. ৮৮৫ এর পর।
  90. তাওবাহ : ৮১
  91. ওয়াক্বেদি, আল-মাগ্বাযি, ১৪০৫ হি., খণ্ড ২, পৃ. ৯৯৬ থেকে উদ্ধৃত শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৯৭।
  92. শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, ১৩৯০ সৌরবর্ষ, পৃ. ৯৭-৯৮।
  93. আয়াতি, তারিখে পায়াম্বারে ইসলাম (সা.), পৃ. ৫৩৭।
  94. শেইখ মুফিদ, আল-ইরশাদ, পৃ. ১৬৬-১৬৮।
  95. বাকারাহ : ১৯৯
  96. ইবনে সায়াদ, তাবাকাতুল কোবরা, খণ্ড ২, পৃ. ২৫৫।
  97. বুখারি, সহিহ বুখারি, খণ্ড ৬, বাবে মারাযুন নাবি (সা.) ও ওয়াফাতুহু, পৃ. ১২, প্রকাশক দারুল জীল, বৈরুত।
  98. সহিহ মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. কিতাবুল ওয়াসিয়্যাহ, ৫ নং অধ্যায়, পৃ. ১২৫৯, প্রকাশক দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি।
  99. শেইখ মুফিদ, মাসারুশ শিয়া ফি মুখতাছারিত তাওয়ারিখিশ শিয়া, ১৪১৩ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৪৬।
  100. নাহজুল বালাগাহ, অনুবাদ সৈয়দ জাফার শাহিদী, খোতবা ২০২, পৃ. ২৩৭।
  101. ইবনে সায়াদ তাবাকাতুল কোবরা, ১৪১০ হি., খণ্ড ২, পৃ. ২২৮।
  102. দেখুন; শাহিদি, তারিখে তাহলিলিয়ে ইসলাম, পৃ. ১০৬-১০৭।
  103. আহযাব : ২১।
  104. হাসান, তারিখে তাদভীনে সিরায়ে নাবাভি (সা.), পৃ. ৪৯।
  105. আনআম : ৩৩
  106. তাবারসি, মাজমাউল বায়ান, খণ্ড ২, পৃ. ২৯৪।
  107. ইবনে হিশাম, সিরাতুন নাবাভিয়্যাহ, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ...।
  108. সূরা শোআরা : ১৯৮; সূরা ফুসসিলাত : ৪৪।
  109. সূরা আত-তাওবাহ : ১২৮; আলে ইমরান : ১৬৪।
  110. ক্বালাম : ৪।
  111. দেখুন; দায়েরাতুল মাআরেফে বোযোর্গে ইসলামি, ‘ইসলাম’ প্রবন্ধ।
  112. তাবাতাবায়ী, সুনানুন নাবি (সা.), খণ্ড ১, পৃ. ২১৪।
  113. আশ-শিফা বিতা’রিফি হুকুকিল মুস্তাফা (সা.), খণ্ড ১, পৃ. ১৫০; আল-মা’রেফাহ ওয়াত তারিখ, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮৩; আল-মুসান্নিফ লিইবনে আবি শাইবাহ, খণ্ড ১১, পৃ. ৫১২।
  114. বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ১৬, পৃ. ২৬০; আল-মিযান ফি তাফসিরীল কুরআন, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৩২।
  115. বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ১৬, পৃ. ২৩৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯।
  116. বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ১৬, পৃ. ২৮৭।
  117. হায়তুস সাহাবা, খণ্ড ২, পৃ. ৫২৬।
  118. ইবনে আসীর, আল-কামেল ফিত তারিখ, খণ্ড ২, পৃ. ২৫১।
  119. পায়ান্দেহ, নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ৩৫-৩৬।
  120. দেলশাদ তেহরানি, সিরায়ে নাবাভি ‘মানতেকে আমালি’, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৫২।
  121. আন-নিসাবুরি, সহিহ মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ. ৩১; আল-বায়হাকি, সুনানুল কোবরা, খণ্ড ২, পৃ. ২১।
  122. ইবনে সায়াদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, খণ্ড ১, পৃ. ৪২৩; আস-সায়ালাবি, জাওয়াহেরুল হিসান ফি তাফসিরিল কুরআন, খণ্ড ৪, পৃ. ৩০৬।
  123. তাবারসি, মাকারেমুল আখলাক, কোম: শারিফ রাযি, ৬ষ্ঠ সংস্করণ, ১৩৯২ সৌরবর্ষ, পৃ. ৩৪-৩৫।
  124. হালাবি, আস-সিরাতুল হালাবিয়াহ, বৈরুত: দারুল মা’রেফাহ, ১৪০০ হি., খণ্ড ৩, পৃ. ৩৫২।
  125. কারাশি, কামুসুল কুরআন, ১৩৭১ ফার্সী সন, খণ্ড ১, পৃ. ১১৯।
  126. কারাশি, তাফসিরে আহসানুল হাদীস, ১৩৭৭ সৌরবর্ষ, খণ্ড ৪, পৃ. ১৭।
  127. রাবীনিয়া, উম্মি, পৃ. ৪০০।
  128. ((لایشبع المؤمن دون جاره)) পায়ান্দেহ, নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ৬৮৩, হা. নং ২৫৪৫।
  129. ((لایفتک مؤمن)) নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ৬৮৩, হা. নং ২৫৫০।
  130. নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ৬৮৪, হা. নং ২৫৫৩।
  131. নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ৪২৪, হা. নং ১২৮৮।
  132. নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ২১১, হা. নং ২৯৩।
  133. ((آفة الدین ثلاثة: فقیه فاجر و امام جائر و مجتهد جاهل)) নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ২১১, হা. নং ২৯১।
  134. ((ابغض الحلال الی الله الطلاق)) পায়ান্দেহ, নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ১৫৭, হা. নং ১৬।
  135. পায়ান্দেহ, নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ১৬০, হা. নং ২৯।
  136. পায়ান্দেহ, নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ১৬৩, হা. নং ৮৬।
  137. পায়ান্দেহ, নাহজুল ফাসাহাহ, পৃ. ৪৬৫, হা. নং ১৪৭৭।
  138. শেইখ সাদুক, খিসাল, ১৩৬২ সৌরবর্ষ, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭।

গ্রন্থপঞ্জি