আহলে কিবলা

wikishia থেকে

নিবন্ধটি ‘আহলে কিবলা’ সম্পর্কে, মুসলমানদেরকে তাকফির করা প্রসঙ্গে জানতে পড়ুন ‘কিবলামুখী নামায আদায়কারীদের প্রতি কাফির ফতোয়া’ নিবন্ধটি।


আহলে কিবলা; ঐ সকল মুসলমানদেরকে বোঝায় যারা পবিত্র কা’বাকে নিজেদের কিবলা হিসেবে জানে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাকফির রোধে এই পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়। অধিকাংশ শিয়াসুন্নি আলেমের দৃষ্টিতে আহলে কিবলার জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম সম্মানিত। আর এ কারণেই তাদের বন্দীদেরকে তাকফির ও হত্যা করা জায়েয নয় এবং তাদের মৃতদের উপর জানাযার নামায আদায় করা ওয়াজিব

সংজ্ঞা

আহলে কিবলা; ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত একটি বিষয়।[১] এ কারণে যে সকল মুসলিম ফির্কাহ পবিত্র কা’বাগৃহকে নিজেদের কিবলা জ্ঞান করে তারা সকলেই আহলে কিবলা।[২] হিজরী চতুর্দশ শতাব্দির বিশিষ্ট শিয়া মুফাসসির মুহাম্মাদ জাওয়াদ মুগনিয়ার মতে, আহলে কিবলা পরিভাষাটি আহলে কুরআন, আহলে শাহাদাতাইনমুসলমানের মত একই অর্থের অধিকারী। আর তারা আল্লাহ্ এবং মহানবি (স.) ও তাঁর সুন্নতের প্রতি ঈমান রাখে এবং কিবলা (কা’বা)-এর দিকে মুখ করে নামায আদায় করে।[৩] এছাড়া, আহলে সুন্নতের হানাফি মাযহাবের বিশিষ্ট আলেম মোল্লা আলী ক্বারী, ঐ ব্যক্তিকে ‘আহলে কিবলা’ বলেছেন যে দ্বীনের কোন অপরিহার্য (জারুরিয়্যাত) বিষয়কে অস্বীকার করেনি। এ কারণে আহলে সুন্নতের আলেমদের মতে যদি কেউ ইসলাম ধর্মের অপরিহার্য কোন একটি বিষয় অস্বীকার করে সে আহলে কিবলার অন্তর্ভুক্ত নয়, যেমন- যদি কেউ কিয়ামতের দিন মৃতদের পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে; এক্ষেত্রে পুনরুত্থান দিবসকে অস্বীকারকারী ব্যক্তি সারা জীবন ধরে ইবাদতে মগ্ন থাকলেও সে আহলে কিবলা হিসেবে বিবেচিত হবে না।[৪]

ফিকহী বিধান

অধিকাংশ শিয়া ও সুন্নি আলেমের দৃষ্টিতে আহলে কিবলার জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম সম্মানিত।[৫] এছাড়াও, তাদেরকে তাকফির করা[৬] ও তাদের বন্দীদেরকে হত্যা করা জায়েয নয় [৭] এবং তাদের মৃতদের উপর জানাযার নামায আদায় করা ওয়াজিব।[৮] মোল্লা আলী ক্বারী’র ভাষ্যানুযায়ী আবু হানিফামুহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস শাফেয়ী আহলে কিবলাকে তাকফির তথা কাফের আখ্যায়িত করতেন না।[৯] তিনি আরও বলেছেন, আহলে সুন্নতের বেশীরভাগ ফকীহই আহলে কিবলাকে তাকফির করতেন না।[১০]

এতদসত্ত্বেও কিছু কিছু মুসলিম ফির্কাহ অপর মুসলিম ফির্কার অনুসারীদেরকে তাকফির করে তাদেরকে হত্যা করাকে বৈধ জ্ঞান করেছেন।[১১] ওয়াহাবিবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব যারা নবী (স.), ফেরেশতাগণ এবং আল্লাহর ওলীদেরকে শাফায়াতকারী ও মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের ওয়াসিলা ও মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব জ্ঞান করেছেন; তাই তারা যদি তাওহিদে রুবুবী’র আকিদা অধিকারীও হয় থাকে।[১২]

নাসেবিখারেজিসহ যারা দ্বীনের অপরিহার্য কোন বিষয় অস্বীকার করেছে তারা কা’বাকে কিবলা হিসেবে মানলেও তাদের বিরুদ্ধে কুফর[১৩] ও তাদের নাজিস (অপবিত্র)[১৪] হওয়ার বিধান জারী হয়েছে।

ফিকহী ব্যবহার

আহলে কিবলা পরিভাষাটি মৃত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট আহকাম [১৫]জিহাদ সংশ্লিষ্ট বিধান[১৬] বিষয়ক অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। বলা হয়েছে যে, উষ্ট্রের (জামালের) যুদ্ধের আগে মুসলমানরা আহলে কিবলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ক বিধান সম্পর্কে জানতো না এবং এ সম্পর্কে তারা উষ্ট্রের যুদ্ধে ইমাম আলী (আ.) থেকে জ্ঞান লাভ করেছেন।[১৭]

তথ্যসূত্র

  1. নারাকি, রাসায়েল ওয়া মাসায়েল, ১৪২২ হি., খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫।
  2. দেহখোদা, লোগাত নামে, যেইলে ওয়াঝে।
  3. মুগনিয়া, তাফসীরুল কাশেফ, ১৪২৪ হি., খণ্ড ১, পৃ. ২৩১।
  4. কারি, শারহে কিতাব আল-ফিকহুল আকবার, ১৪২৮ হি., পৃ. ২৫৮।
  5. রুস্তামি, মামনুইয়্যাতে তাকফিরে আহলে কিবলা আয নেগাহে ফাকীহান ওয়া মুতাকাল্লেমানে তাশাইয়্যু ওয়া তাসান্নুন, পৃ. ৭১।
  6. দ্র: কারি, শারহে কিতাব আল-ফিকহুল আকবার, ১৪২৮ হি., পৃ. ২৫৮; তাফতাযানি, শারহুল মাকাসেদ, ১৪০৯ হি., খণ্ড ৫, পৃ. ২২৮।
  7. মুন্তাযারি, দিরাসাতু ফি বিলায়াতিল ফাকীহ ওয়া ফিকহ আল-দৌলাতিল ইসলামিয়্যাহ, ১৪০৯ হি., খণ্ড ৩, পৃ. ২৯৬।
  8. তুসি, তাহযিবুল আহকাম, ১৪০৭ হি., খণ্ড ৩, পৃ. ৩২৮।
  9. কারি, শারহে কিতাব আল-ফিকহুল আকবার, ১৪২৮ হি., পৃ. ২৫৭।
  10. কারি, শারহে কিতাব আল-ফিকহুল আকবার, ১৪২৮ হি., পৃ. ২৫৮।
  11. রুস্তামি, মামনুইয়্যাতে তাকফিরে আহলে কিবলা আয নেগাহে ফাকীহান ওয়া মুতাকাল্লেমানে তাশাইয়্যু ওয়া তাসান্নুন, পৃ. ৭১।
  12. মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব, কাশফুশ শুবাহাত, ১৪১৮ হি., পৃ. ৭।
  13. নারাকি, রাসায়েল ওয়া মাসায়েল, ১৪২২ হি., খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৬।
  14. মুহাক্কিক কারাকি, জামেউল মাকাসিদ, ১৪১৪ হি., খণ্ড ১, পৃ. ১৬৪।
  15. তুসি, আল-ইস্তেবসার, ১৩৯০ হি., খণ্ড ১, পৃ. ৪৬৮।
  16. মুস্তাদরাকু ওয়াসায়েলুশ শিয়া, খণ্ড ১১, পৃ. ৫৫।
  17. গবেষকদের একটি দল, জেহাদ দার আইনেয়ে রেওয়ায়েত, ১৪২৮ হি., খণ্ড ১, পৃ. ১৮৮।

গ্রন্থপঞ্জি

  • তাফতাযানি, সাইদ উদ্দিন, শারহুল মাকাসিদ, তাহকিক আব্দুর রাহমান উমাইরা, কোম, আল-শরীফ আল-রাযী, ১৪০৯ হি.।
  • জামই আয মুহাক্কেকান দার পেঝুহেশগাহে তাহকিকাতে ইসলামি, জিহাদ দার আইনেয়ে রেওয়ায়েত, কোম, ইন্তেশারাতে যামযামে হেদায়াত, ১৪২৮ হি.।
  • রুস্তামি, আব্বাস আলী, মামনুইয়্যাতে তাকফিরে আহলে কিবলা আয নেগাহে ফাকীহান ওয়া মুতাকাল্লিমানে তাশাইয়্যু ওয়া তাসান্নুন, পেঝুহেশহায়ে এতেকাদিয়ে কালামি, সংখ্যা ৩০, ১৩৯৭ ফার্সি সনের তাবেস্তান।
  • কারি, মোল্লা আলী বিন সুলতান, শারহে কিতাবুল ফিকহ আল-আকবার, আলী মুহাম্মাদ দানদাল, বৈরুত, দারুল কুুতুব আল-ইলমিয়্যাহ মানশুরাতে মুহাম্মাদ আলী বেইযুন, ১৪২৮ হি./২০০৭ খ্রি.।
  • তুসি, মুহাম্মাদ বিন হাসান, আল-ইস্তেবসার ফি মা এখতেলাব মিনাল আখবার, তেহরান, দারুল কুতুব আল-ইসলামিয়্যাহ, ১৩৯০ হি.।